‘একজন মানুষের জীবনের মূল্য পারিশ্রমিক দিয়ে পূরণ করা যায় না’

0

সুমাইয়া জামান-

ক্সবাজার কিংবা সেন্ট মার্টিন এর অশান্ত জলরাশির সমুদ্র সৈকত আমরা হয়তো অনেকেই ঘুরে এসেছি। বিশাল ঢেউয়ের ধাক্কায় কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার আনন্দও উপভোগ করে এসেছি আমরা অনেকেই। কিন্তু যখন হঠাৎ কোনো দানবীয় ঢেউ এসে আমাদেরকে টেনে নিয়ে যায় বেশ কিছুটা দূর যেখানে হয়তো আমাদের স্বভাবিকভাবে দাঁড়াবার মতো যথেষ্ট অবস্থ থাকে না, তখন কিন্তু আমাদের এই আনন্দ একটু অম্লান হয়ে যায়।

সমুদ্র সৈকতে আমাদের এই আনন্দের মূহুর্ত গুলোকে নিরাপদ রাখতে যারা সারাদিন কাজ করে যান তারাই হলেন এই সমুদ্র সৈকতের লাইফ গার্ড। তারা সারাদিন ধরে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, কিন্তু তারা থেকে যান আমাদের শ্রদ্ধাশীল দৃষ্টির আড়ালে। অথচ সমুদ্রের কূলহীন নোনা জলে আমরা ভেসে থাকি তাদের উপর ভরসা করেই।

আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি তাদের ব্যপারে ? তাদের জীবন ব্যবস্থা, আর্থিক অবস্থা বা তাদের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে।

আমাদের শ্রদ্ধাশীল দৃষ্টি থেকে দূরে থেকে যারা আমাদেরকে এইসব দানবীয় জলরাশির কবল থেকে রক্ষা করেন, তাদের মধ্যেই একজন হলেন, কক্সবাজারের ইনানী  বীচের লাইফ গার্ড শফিকুল ইসলাম।

২২ বছরের যুবক শফিকুল ইসলাম কক্সবাজারের এক পাহাড়ের উপর নিজের মা ও ছোট বোন কে নিয়ে থাকেন। সারাদিন লাইফ গার্ড হিসেবে কাজ করে যে পারিশ্রমিক পান, তাতে পরিবার নিয়ে চলে যায় কোনো রকমে। পরিবার নিয়ে ভালোভাবে দিনাতিপাত করার জন্য তিনি দিনে লাইফ গার্ড এর কাজ করেন এবং রাতে হাতে কফির কেটলি নিয়ে সমুদ্র পাড়ে কফি বিক্রি করেন।

লাইফ গার্ড হিসেবে তার কাজের তুলনায় পারিশ্রমিক যথেষ্ট কিনা সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, ‘ একজন মানুষের জীবনের মূল্য পারিশ্রমিক দিয়ে পূরণ করা যায় না। সেখানে আমরা প্রতিদিন এতো মানুষের জীবন রক্ষা করছি, আমাদের যোগ্য পারিশ্রমিক তাহলে কত হবে?’

আমাদের অধিকাংশের ধারণা, লাইফ গার্ড বা এই ধরণের মানুষদের শিক্ষার হার একেবারেই নিম্ন বা হয়তো তারা একেবারেই শিক্ষিত নয়। কিন্তু এই ধারণা একেবারেই ভুল। শফিকুল ইসলাম এর সাথে কথা বলে জানা যায়, কক্সবাজারেই রয়েছে ‘ইংলিশ লার্নিং স্কুল’। যেখানে তিনি সহ অনেকেই ইংরেজিতে কথা বলা এবং এই বিষয়ে পারদর্শি হওয়ার জন্য সেখানে পড়ছেন।

সমুদ্র তীরে কোনো দুর্ঘটনা হয় কিনা এবং তারা তাদেরকে কিভাবে রক্ষা করেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন , ‘ দুর্ঘটনা এখানে প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত পর্যটকদেরকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, কিন্তু অনেকে লাইফ গার্ডের নির্দেশনা না শুনে নিরাপদ দূরত্বের বাইরে চলে যান, ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। তখন আমরা আমাদের লাইফ বোর্ড নিয়ে তাদেরকে রক্ষা করি। আবার অনেকে অনেক বেশি দূরে চলে গেলে দুর্ঘটনার আভাস পেয়ে সে ব্যক্তি পর্যন্ত পৌছাতে পৌছাতে হতো অনেক দেরি হয়ে যায়। আর সমুদ্রে অনেক প্রাণী থাকে, অনেক সময় তীরের কাছাকাছি চলে আসে, তখন তো আর আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ বিপদ সংকেত চলাকালীন এবং সমুদ্রে ভাটা চলাকালীন দুর্ঘটনা বেশি হয়’। বিপদ সংকেত চলাকালীন একদিনে প্রায় ৩২ জনকে উদ্ধার করার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান। তবে সব নির্দেশনা মেনে চললে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন শফিকুল ইসলাম।

সকল পর্যটকদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে  লাইফ গার্ডের জীবন যে সংকটে পড়ে না, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় তাদেরকেও পড়তে হয় এই ভয়াবহ দানবীয় স্রোতের মুখে। কিন্তু তার পরেও তারা আমাদের থেকে পান না সামান্য সম্মান টুকুও।

কিন্তু তার পরেও তারা থেমে নেই এই জীবন বাঁচানোর খেলায়। সমুদ্রে ঘুরতে গিয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সকল নির্দেশনা মেনে চলা আমাদের কর্তব্য এবং সেই সাথে যারা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও আমাদের দায়িত্ব।

 

 

 

 

Share.

Leave A Reply

4 × = sixteen