সবুজে ঘেরা নাসির মোড়

0

দু’পাশে সবুজ গ্রাম। মাঝখানে সরু পীচ ঢালা পথ। রাস্তাটি একেবেকে চলে গেছে অন্য দিগন্তে। যোগ করেছে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দূর ঐ পাড়ার সাথে। কোন এক বিকাল বেলা ঘুরতে বের হলাম বন্ধুদের সাথে। যাবো ঐ পাড়ায়, যেখানে পায়ের নিচে, মাথার উপরে প্রকৃতির সৌন্দর্যের আল্পনা আঁকা রয়েছে।

রাস্তায় উঠতেই গায়ের মেঠোপথ ধরে চলা ভ্যান, অটোরিকশার চালকরা ডাকতে থাকে। মামা মামা! যাবেন নাসিরের মোড়ে? কেন যাবো, সেখানে দেখার মতো কী আছে? ওরা বলে, ওখানে গেলে আপনাদের মন জুড়াই যাইবো! ওখানে প্রকৃতির সাথে সাথে মানুসগুলোও অনেক সুন্দর আচরণে অ সুন্দর দেহে। ওদের কথা মতো চার বন্ধু একসাথে একটি ভ্যানে করে চললাম প্রকৃতির লীলাভূমির কাছে। যেখানে আজ থেকে বিশ বছর আগে নালা, খাল, বিল ও জঙ্গলের জন্যে যাওয়া যেতো না। আর আজ সেখানে চার চাকার গাড়িও চলে! এটি মাদারীপুর জেলাধীন শিবচর থানার মাদবরেরচর ইউনিয়নের অন্তর্গত একটি অঞ্চল।

যেতে রাস্তার দু’পাশে সারী সারী গাছ, ছোট বড় কাঁচা পাকা বাড়ি। একটু দূরেই থই থই করে পদ্মার নীল রঙ্গের পানি। দেখে মনে হবে দূর প্রান্তে আকাশের নীল রঙ্গের আবীর নেমে গেছে। ঐ দৃশ্য প্রতিটি মুহূর্তে ভ্রমণকারীদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে তার দর্শন লাভে। কিছু দূর যেতেই সাজানো গোছানো একটি মোড়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এটাই কি নাসিরের মোড়, যার পরিচিতি সব দিকে ছড়িয়ে পড়েছে? ভ্যান ওয়ালা বললেন, হ্যা দাদা এটাই সেই নাসিরের মোড়! যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে একটি অজপাড়া গাঁ, ছোট্ট একটি সবুজের নগরে। শিক্ষা-দীক্ষার বিবেচনায়ও সভ্য একটি লোকালয়।

হাতের কাছে এতো বড় একটা সুযোগ হাত ছাড়া করলাম না। দেখা করে ফেললাম যার নামে এই মোড় ও নগরের পরিচিতি, সেই নাসির ভাইয়ের সাথে। ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির শ্যামলা বর্ণের মানুষ নাসির ভাই। মুখে লম্বা দাঁড়ি, খাটো খাটো গোঁফ। বেশির ভাগ সময়ে লুঙ্গি, শার্ট আর চোটি জুতা পড়ে নিজেকে গুছিয়ে রাখেন। ভাত, মাছ আর ডাল এসব বাঙ্গালীয়ানা খাবার খেতে তিনি সবসময় পছন্দ করেন। এখানে তিনি সকলের কাছে প্রিয় নাসির ভাই নামেই পরিচিত। তিনি বলেন, সাদাসিদে জীবন যাপন করতেই আমার বেশি ভালো লাগে।

জানতে চাইলাম, এই মোড়টির নাম নাসির মোড় কীভাবে হলো? তিনি বললেন, আমার বাড়ি এই রাস্তার পাশেই। ২০০২/৩ সালের দিকে এই রাস্তার সংস্কারের কাজ হয়। আমাদের পাশেই পাচ্চর বাস স্ট্যান্ড, যেখান থেকে এই রাস্তার শুরু। ওখান থেকে আসার সময় যারা যারা আমাকে চিনতো, তাঁরা আমার নাম ভ্যান  বাঁ অটোরিকশাকে বললেই আমাদের এখানে নিয়ে আসতো। মূলত সেখান থেকেই আস্তে আস্তে আমার নামে এই মোড়ের পরিচিতি।

তিনি আরও বলেন, একদিন এই মোড়ের কাছেই প্রায় ২০/২৫ টি বাড়িতে ডাকাতি হয়। সেখানে আমাদের থানার এমপি নুরুল আলম চৌধুরী লিটন সাহেব আসেন। তিনি প্রথমে এখানে আসার আগে লোকদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কোথায় এই ডাকাতি হয়? সবাই বলে নাসির মোড়ের দিকে। সেখান থেকে নাসির মোড় নামেই এই মোড়ের নাম আনুষ্ঠানিক পরিচিতি পায়।

পৃথিবীর প্রত্যেকটি শহর, নগর, অঞ্চল এবং লোকালয় গড়ে ওঠে এভাবেই কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ঐ অঞ্চলের বিশেষ কিছুকে কেন্দ্র করে। নাসির মোড়ের নাম করণেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একদিন হয়তো এই মানুষটি থাকবেন না, কিন্তু মোড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নগরটি যুগ যুগ ধরে থেকে যাবে এই ধরায়। নাসির ভাই পরপারে চলে গিয়েও স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে ইতিহাসের পাতায় ও মানুষের মুখে। সেই সফলতার স্বপ্ন তাঁর চোখে মুখে ভেসে ওঠে।

লেখক: হাকিম মাহি-

গণমাধ্যম কর্মী ও শিক্ষার্থী, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Share.

Leave A Reply

− two = one