শুদ্ধ কৃষির আধুনিক কৃষাণি কাকলি খান

0

হাকিম মাহি

‘কৃষি নিয়ে কোন অভিজ্ঞতা আমার নেই। কিন্তু আগ্রহ অনেক। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে বিষের বিরুদ্ধে আমার লড়াই। একজনের মেয়ে, একজনের মা, একজনের বৌ হিসাবে, পরিবারের প্রতি আমার দায়িত্ব অনেকটা। তারমধ্য থেকে নিরাপদ খাবার নিয়ে কাজ করা আমার জন্য খুব কঠিন। যেটা কল্পনাই করা যায়না। কতটা যে শ্রম দিতে হয় শুদ্ধ কৃষিতে, তার হিসাব করলে শেষ হবেনা। এই নিরাপদ খাবারের কাজ করতে গিয়ে আমার একটা মাত্র মেয়ে সাড়ে তিনবছর বয়স, তাকে একদমই সময় দিতে পারিনা! কিন্তু তার মুখে মা হিসেবে বিষ তুলে দেইনা! আমার মেয়েকে না হয় নিরাপদ খাবার খাওয়ালাম, কিন্তু ওর মতো তো অনেক শিশু রয়েছে, তাঁদের কি হবে!’ কথাগুলো বলছেন আর বার বার দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন কাকলি খান।

ঢাকার মতো একটি আধুনিক ও ডিজিটাল শহরে ফ্যাশনেবল জীবনযাপন করুয়া একজন নারী, মানুষের মুখে নিরাপদ খাবার তুলে দেয়ার জন্য কাঁদে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাগলের মতো হন্য হয়ে ঘুরে বেড়ায় এটি সত্যিই বিবেককে নাড়া দেয়ার মতো। সপ্তাহে ৩/৪ দিন তিন বেলা খাবার ঢাকার আশেপাশে বিভিন্ন কৃষি ক্ষেতে বসেই তাঁকে খেতে হয়। অথবা অনেক সময় এতটাই কাজে ব্যস্ত থাকেন খাবারের কথাও মনে থাকেনা তাঁর। কাকলি খান বলেন, ‘আমার একটা সবজির খামার আছে কেরানীগঞ্জে, সেখানে আমি নিজেই ফসল ফলাই এবং এখান থেকে আমি নিজে খাই, বাকীটা আমার সামনেই গ্রীনরোডের শুদ্ধ কৃষিতে বিক্রি করি। এছাড়া আমাদের দেশের প্রায় ৪৭ টি জেলার অর্গাণিক চাষিদের সাথে আমার নিয়মিত আসা যাওয়া ও যোগাযোগ রয়েছে। যাদের নিকট থেকে আলোচনা সাপেক্ষে সবজি এবং চাল, ডাল, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমার এই ছোট্ট দোকান ‘শুদ্ধ কৃষি’তে এনে থাকি’।

শুদ্ধ কৃষি সপ্তাহে সাত দিনই সকাল ৯ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এই দিনগুলোতে সকল ধরণের কৃষি পণ্য চাল, ডাল, মাছ, মাংস ও সবজি থেকে শুরু করে সব কিছু পাওয়া যায়। তবে বিশেষ করে শুক্রবার ও মঙ্গলবার সকাল ৮ টা থেকে সারাদিন রাসায়নিক সার মুক্ত কাঁচা সবজির হাট মিলে। পাওয়া যায় মৌসুমি ফলফলারি। ঘি, সরিষার তেল ও হাওড়, নদীর টাটকা মাছ। কাকলি খান বলেন, ‘আমার দোকানের মাছের মান নির্ণয়ে মাঝে মাঝে আমি নিজে জেলেদের সাথে নদীতে চলে যাই। হাঁস, মুরগি গ্রামে চড়া কিনা তাও নিশ্চিত করি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ও কৃষকদের বাসায় দিনের পর দিন বেড়ানোর মধ্যদিয়ে। সবচেয়ে বড় কথা হলও, আমি নিজে টাঙ্গাইলে একটি কৃষক স্কুল পরিচালনা করি। সেখানে কৃষকদের বিষযুক্ত খাবার উৎপাদনে ট্রেনিং দিয়ে থাকি। এছাড়া কেরানীগঞ্জ, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ এবং ঝিনাইদহে আমার নিজস্ব কাঁচা সবজির খামার রয়েছে’। ঘুরে দেখা গেলো, কাকলি খান তাঁর ৬১ গ্রীনরোড কনকর্ড টাওয়ার মার্কেট শুদ্ধ কৃষিতে নিজ হাতে দোকানের সবজি বিক্রি করছেন।

‘আজ থেকে সাত বছর আগে আমার ফুফু ক্যান্সারে মারা যায়। ডাক্তার বলেছে ওনার খাদ্যের ভেজাল থেকে এই ক্যান্সার হয়েছে’। সেদিন থেকে কাকলি খান মনে মনে শপথ নিয়েছিলেন, সে আর তাঁর একজন আত্মীয়কেও ভেজাল যুক্ত খাবার খাওয়াবেন না। মূলত সেখান থেকেই কাকলি খানের বিষ মুক্ত খাদ্য আন্দোলন। তিনি বলেন, ‘এই লড়াইটা করতেই হবে আমাকে, আমার সন্তানের জন্য, আমার সন্তানের মতো আরো অনেকের সন্তানের জন্য! তাদের ভবিষ্যৎ এর জন্য!! জানি এটা আমার একার বা সীমিত কিছু এই ভাবনার মানুষের দ্বারা সম্ভব না! অনেককে এগিয়ে আসতে হবে! একটা সময় অনেকে এগিয়ে আসবে, আমি আশাবাদী এ ব্যাপারে! আমি আমার কাজটাকে খুব ভালবাসি, ঠিক আমার সন্তানের মতো করে, সপ্তাহে সাতদিনই সময় দিতে হয়। বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে যায়. কৃষকদের সাথে সময় কাটাই! বিভিন্ন বিষয়ে জানার চেষ্টা করি। বিশেষ করে যারা নিরাপদ খাবার নিয়ে কাজ করে সেইসব কৃষকদের প্রতি আমার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা অন্যরকম ও গুরুত্ব অপরিসীম’!

ভেজাল মুক্ত খাবারের কাজ করতে গিয়ে কাকলি খান এই পেশাটিকে চ্যালেঞ্জিং ভাবেই দেখেছেন। যদিও এই উদ্যোগটি সকলের মঙ্গলের জন্য, কিন্তু কখনো কখনো অসাধুদের জন্য সহজভাবে করা যায় না। আবার অনেক ভুক্তা রয়েছেন, তারা বাহিরের ভেজাল খাবারের সাথে এই বিষমুক্ত খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা মনে করেন, ক্ষেত থেকে যেই তাজা সবজি আসে, তাই ফ্রেস ও বিষযুক্ত। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘একটা কথা সবসময় মনে রাখতে হবে, বিষের বিরুদ্ধে লড়াইটা সবসময়ের জন্য কঠিন! কিছু ব্যক্তিগত হিসাব বাদই দিতে হবে! আমার লড়াই টা আমি চালিয়ে যাচ্ছি! কিন্তু প্রতিনিয়ত হতাশও হচ্ছি অনেকের আচরণে, আবার অনেকের ভালবাসাও পাচ্ছি! আমাদের প্রশ্ন যেমন করতে হবে, সাথে সাথে অর্গানিক খাবার কি সে ব্যাপারেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন’।

কাকলি খান আরো বলেন, ‘আমার শুদ্ধ কৃষিতে যে সব ফসল এইসব কৃষকদের কাছ থেকে আসে, তাদের প্রত্যেক কে আমি ন্যায্য মূল্য দেয়ার চেষ্টা করি! আবার যে ভোক্তা তিনি যেন নিরাপদ খাবার কিনতে যেয়ে অসহায় না হয়ে পড়েন আমি এ ব্যাপারে খুব খেয়াল করি! কারণ আমি বুঝি যে উৎপাদন করছে তাকে যদি সঠিক মূল্য না দিয় তাহলে সে বিমুখ হয়ে পড়বে, উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে! যেটা খুব ভয়ংকর হবে! আবার যে ভোক্তা তার একটা বাজেট মতো চলে,এই-দুটো জায়গা নিয়ে কাজ করা খুব কঠিন! আমি শুদ্ধ কৃষির কাজ শুরু করার পর থেকে সবজিতে ভর্তুকি দিচ্ছি প্রতিনিয়ত! শুকনা পণ্যে লাভ থাকে কিছু! কিন্তু সবজিতে লাভ থাকেনা বললেই চলে। একটা কথা খুব প্রচলিত অর্গানিক প্রডাক্ট একটা শ্রেণীর জন্য,আমি এটার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে! মধ্যবিত্তের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে আমাদেরকে! জানি এখন কঠিন! তবুও চেষ্টা করে যেতে হবে’।

সবশেষে কাকলি খান সকল প্রতিকূলতার মধ্যে এই নিরাপদ খাবারের আন্দোলন চালিতে যেতে চান। তিনি মনে করেন, যে আন্দোলনে নেমেছি, সেখান থেকে আর পিছপা হওয়ার হেতু নেই। এখন সময় পরিবর্তনের, এখন সময় এগিয়ে যাবার। কারণ, , বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এগুলোর বিকল্প হয়, কিন্তু পৃথিবীর সকল কিছুর মধ্যে শুধু খাদ্যেরই বিকল্প হয় না। খাদ্যই বেঁচে থাকার সর্বপ্রথম চালিকা শক্তি। কাকলি খান বলেন, ‘আমি আমার জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এই নিরাপদ খাদ্যের গান গেয়ে যাবো। আমি চাই, জয় হোক খাদ্যের আর জয় হোক মানবতার’।

লেখকঃ গণমাধ্যম কর্মী।
hakimmahi2017@gmail.com

Share.

Leave A Reply

ten × one =