রাজধানীর মোহাম্মাদপুরেই আছে শত বছরের পুরোনো স্থাপত্য

0

সুমাইয়া জামান-

পৃথিবীর যে কোনও বিষয়েই আমাদের অজানার সংখ্যা কিন্তু কম নয়। চার দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন অনেক মানব সভ্যতার ইতিহাস, যার কিছু অংশ হয়তো আমরা জানি, কিন্তু বেশির ভাগই আমাদের অজানা থেকে যায়। দূরের সমস্ত সভ্যতার কথা হয়তো জানা হয় না, কিন্তু আমাদের সচরাচর চলার পথেও চোখের সামনেই এমন অনেক ইতিহাস দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে সম্পর্কে আমারা হয়তো অনেকেই জানি না।

রাজধানীর লালবাগ কেল্লা কিংবা আহসান মঞ্চিলের  নাম কিন্তু আমরা অনেকেই শুনেছি বা নিজেই ঘুরে এসেছি। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের আঙ্গিনাতেও হয়তো যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমাদের অনেকেরই। কিন্তু রাজধানীর মোহাম্মাদপুরেই রয়েছে এমনই একটি  স্থাপত্য, আমাদের কত জনের সে বিষয়ে জানা আছে?

রাজধানীর মোহাম্মাদপুরের কাটাসুর এলাকার সাতমসজিদ নামের জায়গাটি আমরা অনেকেই চিনি। আমাদের মধ্যে কারও হয়তো নিত্য যাওয়া আসাও রয়েছে এই জায়গাটি দিয়ে। কিন্তু জায়গাটির ইতিহাস সম্পর্কে আমরা কত জন জানি? কেনো জায়গাটির নাম সাতমসজিদ হলো তা আমরা অনেকেই জানি না।

মূল রাস্তা থেকে সংযোগ নিয়ে একটি রাস্তা বেঁকে গেছে বামে। প্রশস্ততার দিক দিয়ে ছোট এই রাস্তার নাম সাতমসজিদের রাস্তা। রাস্তা দিয়ে ঢুকলে শুরুতেই চোখে পড়বে প্রাচীন আমলের ধাঁচে তৌরি একটি মসজিদ, যার মাথায় মোট সাতটি গম্বুজ রয়েছে এবং মসজিদের সামনে একটি বেশ বড় উদ্যানও রয়েছে। মসজিদের ভেতর ৪ টি কাতারে ৯০ জনের মতো মানুষ নামাজ আদায় করতে পারবেন। এটিই সাতমসজিদ, যার নামে এই রাস্তাটি মানুষের কাছে পরিচিত।

ধারণা করা হয়, ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে নবাব শায়েস্তা খাঁ মসজিদটি নির্মাণ করেন। তখন মজিদের পাশ দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী বহমান ছিলো। এই নদীর তীরেই এসে ভিড়তো  লঞ্চ ও নৌকা। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তা কল্পনা করাও কষ্টকর। বড় দালানকোঠায় ভরে উঠেছে মসজিদের চারপাশ। সীমানা প্রাচীর সহ জমি, মসজিদ,সমাধি সৌধ সবই প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক ঘোষিত বর্তমানে একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।

মসজিদটির বিপরীত পাশে চোখ রাখলেই দেখা যায় আরও একটি স্থাপত্য। যেটি ঠিক মসজিদেরই অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। এর ভেতর আবিষ্কৃত হয়েছে একটি সমাধি। অজানা সমাধি বলে পরিচিত এটি। আবার ‘বিবির মাজার’ বলেও এটি পরিচিত অনেকের কাছেই। কারণ, ধারণা করা হয় এখানে শায়েস্তা খাঁ এর কোনও এক মেয়ের সমাধি রয়েছে এখানে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে কেউই বলতে পারেন না যে, এখানকার মাটিতে শত বছর ধরে কে শুয়ে আছেন। আর তাই, এই সমাধিটির নাম অজানা সমাধি হয়েছে।

সমাধিটিকে ঘিরে আছে যে সৈধটি বা কোঠাটি, সেটি ভেতর থেকে অষ্টকোনাকৃতি এবং বাইরের দিকে চতুষ্কোনাকৃতির। বেশ কিছুদিন আগে সমাধিক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। বর্তমানে সংস্কার করার পর এটি প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক ঘোষিত একটি সংরক্ষিত পুরাকির্তি।

মাজারটিকে বর্তমানে পাক-পবিত্র করে রাখা হয়েছে। ফুলদিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে তার চারপাশ। মাজারের সৌধের সামনে একটি বাগান করার পরিকল্পনা চলছে এবং বাগানের কাজও ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

অনেক বড় বড় স্থাপত্যের কথা আমরা জানি, এক নামে সেসবের ইতিহাসও বলে দিতে পারি আমরা অনেকেই। কিন্তু চলার পথেই সকলের দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেছে এই সমাধিটি। কতজনের জানা আছে এই শত বছরের স্থাপত্যের ইতিহাস? কত জনই বা জানেন এখানের এই সমাধির অস্তিত্ব সম্পর্কে? আমাদের চলার পথে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে, যেগুলো আমাদের গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে অবহেলায়, অযত্নে পড়ে থাকে। অথচ সেগুলো আমাদের জাতীয় সম্পদেরই  একটি অংশ।

বাংলাদেশের যা কিছু আছে, সেসবই আমাদের নিজের। এসবের যত্ন বা রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। সচেতন হতে হবে সকলকে নিজের জন্য, নিজের দেশের জন্য।

Share.

Leave A Reply

seven ÷ = 1