রফিক, সালাম, বরকত ও জব্বার আমরা তোমাদের ভুলবো না

0

একটি দেশের সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুই হলো ঐ দেশের ভাষা। আর ভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ঐ জাতির সংস্কৃতি। ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই বাঙ্গালী জাতি মেতে ওঠে মায়ের ভাষার আনন্দে। মা যেমন তাঁর সন্তানকে সকল ভয় শঙ্কা থেকে আগলিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি একটি ভাষাও তার ভাষীদের আগলিয়ে রাখে সকল বাঁধা বিপত্তি থেকে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এমনই একটি দিন ছিলো, যখন ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলো জীবন্ত কিছু মানুষ। ইতিহাসে বাঙ্গালীই প্রথম, যারা ভাষার জন্য জীবনও দিতে পেরেছে। এই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই আজকের এই সোনার বাংলা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে দুটি ভূখণ্ডের সৃষ্টি হয়। দু’দেশের ভাষা দুটি। আর ভাষাকে কেন্দ্র করে আচার, ব্যবহার, পোশাক পরিচ্ছদও আলাদা। কারণ ৪৭ এ দেশ ভাগ হয়েছিলো ধর্মানুসারে। তবে, দুই পাকিস্তানের ধর্ম ছিলো ইসলাম। কিন্তু ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো ছিলো আবার আলাদা।

আজ যদি আমরা আমাদের দেশে বসবাসকারী পাকিস্তানী ক্যাম্পবাসীদের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো তাঁদের ধর্মীয় উৎসব ও আমাদের দেশের ধর্মীয় উৎসব অনেকটাই আলাদা। সুতরাং সকল দিক থেকে ওদের সাথে আমাদের এই পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশের কোন মিল ছিলো না। আর আদও নেই।

১৯৪৮ সালের ২১ শে মার্চ কার্জন হলে কায়েদ এ আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। দাম্বিক এই ঘোষনায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ফেটে পরে বাঙ্গালি। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। সামনে আসে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সবচেয়ে মজার ও আশ্চর্যের বিষয় হলো এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের জন্মগত নাগরিক ছিলেন না, আর উর্দু ভাষায় কথাও বলতে পারতেন না তিনি। অথচ তিনি বললেন, উর্দুই হবে দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। যেমনটি মনে হয়, বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার মতো।

অবশেষে গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতি বছর গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হয়।

এভাবেই আজকের এই আমাদের মায়ের ভাষা, কথ্য ও লেখ্য ভাষা, প্রাণের ভাষা বাংলা নিজেদের করে পেয়েছি। যত দিন এই পৃথিবী থাকবে, ততদিন ভাষাটি টিকে থাকবে। আমাদের দেশের নতুন প্রজন্ম এই দিনে সকালে উঠে ফুল নিয়ে, খালি পায়ে শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগী শহীদদের। রফিক, সালাম, বরকত ও জব্বার আমরা তোমাদের ভুলবো না। এভাবেই চির অমর হয়ে থাকবে প্রতিটি বাঙ্গালীর হৃদয়ে।

লেখক: হাকিম মাহি-

শিক্ষার্থী, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন এবং মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Share.

Leave A Reply

+ 9 = ten