মায়ের সেবার জন্য বিয়ে করিনি

0

সিনথিয়া করিম-

সেদিনের পড়ন্ত বিকেলে রাজধানীর ধানমণ্ডির সীমান্ত স্কয়ারের ছাদের উপরিতলে অবস্থিত খাবারের দোকানগুলোর মজাদার খাবারের সাথে বাড়তি মাত্রা যোগ করে চারিদিকের পরিবেশ। নিজেদের যান্ত্রিক জীবন থেকে এক চিলতে সময় বের করে এই মনোমুগ্ধকর পরিবেশে সোপর্দ করেন শহুরে মানুষজন।

ব্যস্ততম শহরে ব্যস্ত নাগরিকগণ নিজেদের ব্যস্ততার ভিড়ে অনেক কিছুই এড়িয়ে যান। সমাজের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের উঁচুনিচু পথচলার গল্প, সংগ্রামের গল্প কিছুই ছুঁতে পারেনা তাঁদের।

এমনি হঠাৎ করে চোখ আটকে গেলো সেখানে দায়িত্ব পালনরত এক নারী নিরাপত্তা কর্মীর দিকে। বেশ বীরদর্পে এদিক সেদিক নজরে রাখছেন তিনি। তাঁর সাথে কথা বলার কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে ছুটে যাই তাঁর কাছে।

পেছন থেকে ডাকতেই মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকান। চট করে চোখ যায় তাঁর নিরাপত্তাকর্মী খচিত পরিচয়পত্রে। এক পলকেই দেখে নিই তাঁর নাম মোছা. সখিনা। নারী নিরাপত্তাকর্মী তো নরম হবে এই ভেবে ভুল বোঝার কোন কারণ নেই। প্রথমে আলাপ জমাতে একটু কষ্টই হয় বটে। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে যেন একটু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার গতি বাড়ল। জানতে চাই তাঁর সম্পর্কে। কোথায় থাকেন, কতদিন এই পেশায় কর্মরত আছেন ইত্যাদি।

ধীরে ধীরে কথার ঝাঁপি খুলতে থাকেন। রাজধানীর হাজারীবাগের স্থায়ী বাসিন্দা তিনি। এখানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন ২ বছর ধরে। বয়স ৪০ এর কাছাকাছি হলেও এখনো অবিবাহিত। একটু কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলাম কেন এখনো বিয়ে করেননি। জানালেন নিজের মায়ের দেখাশোনার জন্য আজ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি তিনি। আজ থেকে ২৫ বছর আগে বাবা মারা যান। ভাই বোন থাকলেও কেউ মায়ের খোঁজ নেন না। তিনি একাই উপার্জন করে সংসার চালান।সম্মানিটুকু পর্যাপ্ত না হলেও তা দিয়েই কষ্ট করে দিন পার করেন।

২ বছরের কর্মজীবনে অভিজ্ঞতা নেহাতই কম নয়। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেন নানা বয়সী নানা পেশার মানুষদের। নিজের সহকর্মীদের সাথে ভালো সম্পর্ক তার। বর্তমান চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে জানতেন না পদবি হবে একজন নিরাপত্তা কর্মী। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে যোগ দেন। পূর্বে এই কাজের কোন প্রশিক্ষণ না থাকলেও পরবর্তী সময়ে এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। প্রতি সপ্তাহে এখানেই প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন কর্তৃপক্ষ।

এখনো বিয়ে করেননি দেখে নিঃসঙ্গতা অনুভব হয়না? এমন প্রশ্ন হয়তো হারহামেশাই তীরের মতো গিয়ে বুকে আঘাত করে তাঁকে। একটু সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে এক হাসিমাখামুখে খুশির সংবাদ জানালেন। বললেন, কিছুদিনের মধ্যেই নিজের নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছেন। তবে শত আনন্দের মাঝেও এক চিলতে দুশ্চিন্তা দেখা মেলে তার চাহনিতে। বুঝে নিতে অসুবিধা হয়না যে, এই চিন্তার মূল বিষয় নতুন জীবনের নতুন সঙ্গী। কেমন হবেন তিনি, কিভাবে মানিয়ে নিবেন- এগুলোই হয়তো দুশ্চিন্তার মূল কারণ।

সেদিনের মতো গল্পের ইতি টানতে যাওয়ার আগে একটি ছবি তুলতে চাইলাম সীমান্ত স্কয়ারের ছাদের উপরিতলে দায়িত্ব পালনরত একমাত্র নারী নিরাপত্তা কর্মী মোছাঃ সখিনার। কিন্তু বাধ সাধলেন তিনি। নিজের নতুন জীবনে কোনরূপ সমস্যা চান না বিধায় ছবি তুলতে দিলেন না। তবে সংবাদের প্রয়োজনে পেছন থেকে তার এক অবয়ব নিজের মুঠোফোনে ধারণ করে সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে চলে এলাম। পিছন ফিরে তাকে খুঁজতেই দেখি আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যান তিনি।

Share.

Leave A Reply

sixty two − fifty eight =