মাটির পাত্রে অজানা লিপি

0

আহসান হবীব-

মানুষের লেখার ইতিহাস আনুমানিক দশ হাজার বছরের। পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষাই ব্যবহার করে অক্ষরলিপি, সাধারণ অর্থে যাকে বলি বর্ণমালা। সীমিত সংখ্যক বর্ণের সাহায্যেই যে কোনও জিনিস লিখে ফেলা যায়। বাংলা বর্ণমালায় ৫০টি বর্ণ; ইংরেজি যে বর্ণমালার সাহায্যে লেখা হয়, সেই রোমক বর্ণমালায় ছোট বড় হরফ মিলিয়ে আছে ৫২টি বর্ণ।

আমরা যখন আমাদের পরিচিত ভাষায় পরিচিত লিপিতে লেখা দেখি, তখন আমাদের লক্ষ থাকে লেখার বিষয়ের প্রতি। কী ভাবে লেখা হয়েছে, অর্থাৎ লিপির সূক্ষ্ম বৈচিত্রের দিকে বড় একটা নজর দিই না। যখন কোনও অপরিচিত লিপি দেখি, সেই লিপি পড়তে পারি না। লেখাটি তখন আমাদের কাছে অনেকটা সাংকেতিক। যেমন হরপ্পা লিপি। গত একশো বছর ধরে বহু চেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে পাঠোদ্ধার করা যায়নি। আবার অনেক সময় আসে অভাবনীয় সাফল্য। উদ্ধার হয় পাথর বা অন্য বস্তুতে খোদাই করা সংকেতের অর্থ। আত্মপ্রকাশ করে অনেক অজানা ইতিহাস।

১৮ বছর বয়স থেকেই ভেনট্রিস ‘লিনিয়ার বি’ লিপির প্রতি আকৃষ্ট হন। তখনও পর্যন্ত কেউ তা পাঠোদ্ধার করতে পারেননি। এই লিপির সঙ্গে ‘এট্রুস্কান’ ভাষার সম্পর্ক আছে, এই অনুমানের উপর নির্ভর করে ভেনট্রিস লিপির পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেন। এট্রুস্কান আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকের ইতালির এক প্রাচীন সভ্যতা, যা গ্রিক সভ্যতার দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত ছিল। ভেনট্রিস বুঝতে পারেন ‘লিনিয়ার বি’ লিপিটির ভাষা এট্রুস্কান নয়। গভীর মনোযোগের সঙ্গে দিনের পর দিন লিপির নিদর্শনগুলি বিশ্লেষণ করে তাঁর মনে হয়, ‘লিনিয়ার বি’ লিপি যে ভাষাটির জন্য ব্যবহৃত হত সেটি খুব সম্ভবত ল্যাটিনের মতো একটি বিভক্তি-নির্ভর ভাষা। ল্যাটিন বা সংস্কৃতে শব্দরূপের শেষে যেমন বিভক্তিগুলি ঘন ঘন পাল্টে যায়, এই ভাষাতেও সম্ভবত তা-ই হয়। এই অনুমানের উপর নির্ভর করে ভেনট্রিস প্রতিটি ছবি ও চিহ্নের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি চিহ্নিত করতে শুরু করেন। এই ভাবে প্রাথমিক পর্বে স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির একটি অনুমাননির্ভর তালিকা তৈরি করেন। ক্রমশ প্রকাশ পায়, ‘লিনিয়ার বি’ ভাবলিপি ও দললিপির (সিলেবিক স্ক্রিপ্ট) মিশ্রণ; লিপিটি লেখা হত বাঁ দিক থেকে ডান দিকে।

ভেনট্রিসের সাফল্য এল কিছুটা আকস্মিক ভাবে। ১৯৩০-এর দশকে কার্ল ব্লেগ্যান নামে এক মার্কিন পুরাতাত্ত্বিক পাইলস নামে মূল গ্রিক ভূখণ্ডের একটি শহরে খননকার্যের ফলে প্রায় ছ’শোটি পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার করেন, যেগুলি ‘লিনিয়ার বি’ লিপিতে লেখা। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় এই আবিষ্কারের কথা গবেষক মহলে বিশেষ পৌঁছতে পারেনি।

ভেনট্রিসের হাতে এই নতুন তথ্য এলে তিনি তা বিশ্লেষণ করে দেখলেন, এই নব-আবিষ্কৃত মৃৎপাত্রগুলিতে এমন কিছু নতুন চিহ্ন ও ছবি আছে যা স্লিম্যান ও ইভ্যান্সের আবিষ্কৃত নিদর্শনগুলিতে ছিল না। ভেনট্রিস অনুমান করলেন, এই ছবিগুলি সম্ভবত কোনও স্থান-নামকে নির্দেশ করে। সেই কারণে ছবিগুলি পূর্ব-আবিষ্কৃত নিদর্শনে অনুপস্থিত। তাঁর এই অনুমান ছিল অব্যর্থ, এবং সত্য।

ইতিমধ্যেই প্রস্তুত স্বর ও ব্যঞ্জনের তালিকা। এর সাহায্যে ব্লেগ্যানের আবিষ্কৃত নিদর্শনগুলির স্থান-নাম সঠিক ভাবে পাঠোদ্ধারে সক্ষম হলেন ভেনট্রিস। দীর্ঘ ১২ বছরের চেষ্টায় ১৯৫২ সালে খুলল ‘লিনিয়ার বি’ লিপির বন্ধ দরজা। বোঝা গেল, এই লিপিটি যে ভাষার জন্য ব্যবহার করা হত তা গ্রিক ভাষার এক প্রাচীনতম রূপ—‘মাইসেনীয় গ্রিক’। কোনও দোভাষী নিদর্শনের সাহায্য ছাড়াই, সম্পূর্ণ অনুমানের উপর নির্ভর করে পাঠোদ্ধার হল একটি অজানা লিপি ও ভাষা। ১ জুলাই ১৯৫২ ভেনট্রিস এই পাঠোদ্ধারের কথা জানান বিবিসির মাধ্যমে। পরের চার বছর জন চ্যাডউইক-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সম্পাদনা করেন মাইসেনীয় গ্রিকের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। দুর্ভাগ্য, এই বই প্রকাশের অল্প দিনের মধ্যেই এক পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ভেনট্রিস। বয়স তখন মাত্র ৩৪।

 

Share.

Leave A Reply

three × two =