মন এবং একাগ্রতা (পর্ব-১)

0

জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের অপার জানার আগ্রহ। এই জানার আগ্রহটা ঠিক কোথা থেকে সৃষ্টি তা প্রশ্নবিদ্ধ সেই প্রাচীন কাল থেকেই। জানার এই নিরঙ্কুশ প্রচেষ্টা কি মন থেকে আসে? মন বলে আদৌ কিছু আছে কিনা সে নিয়ে বেশ সংশয়ের উদ্রেক করে? মন বলে যদি কিছু থেকে থাকে তবে তার অবস্থান কোথায়, কিভাবেই বা এই তথাকথিত মন কাজ করে থাকে? যবে থেকে মন নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে তবে থেকেই মনের অস্তিত্ব নির্ণয়ে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকগণ বিভিন্নভাবে মনোজগতে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছেন। এই চিন্তা-চেতনা প্লেটো, এরিস্টটল দার্শনিক যুগ থেকেই সূত্রপাত।

সাধারন ভাবে মন বলতে বোঝায় বুদ্ধি ও বিবেকবোধের এক সমষ্টিগত রূপ যা চিন্তা, আবেগ, অনুভূত, ইচ্ছা এবং কল্পনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আর মনের অবস্থান নির্ণয় হয় যখন সংবেদনশীল ক্রিয়ার মাধ্যমে কোন তথ্য পেনিয়াল গ্রন্থিতে পৌছায়। জড়বাদী দার্শনিকগণ মনে করেন- মানুষের মনের প্রবৃত্তির কোন কিছুই ভিন্ন নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক থেকে প্রলুব্ধ শারীরবৃত্তিক কর্মকান্ডের মাধ্যেমেই মনের সৃষ্টি।

মনকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়ন সম্ভব নয়। তবে এভাবে বলা যেতে পারে, মন হল এমন কিছু যা নিজের অবস্থা এবং ক্রিয়াগুলি সম্পর্কে সচেতন। অর্থাৎ মন হল এমন চেতন ক্রিয়া যা জড় থেকে আলাদা করা হয়।

মনকে তিনটি ভিন্নার্থে ব্যবহার করা হয়-

১. মন বলতে চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা-এই তিনের মানসিক কাজগুলির সমষ্টিগত রূপকে বোঝায়। এটি অভিজ্ঞতামুলক মতবাদ নামে স্বীকৃত।

২. আধ্যাত্মবাদীদের মতে, মন বলতে চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা-এই মানসিক কাজগুলি থেকে স্বতন্ত্র দেহাতিরিক্ত একস্থান, অপরিবর্তিত আধ্যাত্ম সত্তাকে বুঝায়।

৩. ভাববাদীরা এ দুইয়ের সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন। তাদের মতে, মন বলতে বোঝায় এক মূর্ত আধ্যাত্মিক ঐক্যের সম্বন্ধ যা চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা প্রভৃতি মানসিক প্রক্রিয়া ছাড়া কিছুই নয়, অথচ যা নিজের স্বাতন্ত্র না হারিয়ে এই সকল মানসিক কাজের ভিতর দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে।

ফ্রয়োডিয় মনোদর্শনানুসারে মনের তিনটি স্তর দেখা যায়- অচেতন, অবচেতন ও চেতন। চেতন ও অবচেতন মনের যৎসামান্য শেষোক্ত স্তর পেরিয়ে মানুষ তার মনের বৃহৎ স্তর অচেতনে পৌছায়। মানুষের ধ্যান-ধারণা তথা চিন্তা-চেতনা, চাওয়া-পাওয়া আর কামনা-বাসনা’র যে অজানা স্তর তা এই অচেতন স্তর। যদিও এ স্তর সম্পর্কে মানুষ ততটা সচেতন নয়। এই অচেতন স্তর মানুষের কাছে যেমনটা দূর্জ্ঞেয়, তেমনটি অজ্ঞেয়ও বটে। মানুষ জগৎ-সংসারের অসীমতার কত কিছুরই না রহস্যভেদ বা আবিস্কার করেছে, অথচ তার দেহাস্থিত মনকেই আজও রপ্ত করতে পারেনি। আধ্যাত্মবাদী বাউল স¤্রাট ফকির লালন শাহ্ নিতান্তই মনকেই খুঁজেছিলেন। তার কথায়- ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’।

যখন কোন কিছু লেখার উৎসাহ প্রকাশ করে লিখতে যাই ঠিক সেটা আর সেভাবে হয়ে ওঠে না। মনটা বড়ই অবাধ্য, তার ইচ্ছেমত চলে। কোন দিন কথা রাখেনি; আর রাখবে বলে মনেও হয়না। মনটা যে ভারি উতলা। মনের এই সহাবস্থানকে অবচেতন( Sub-Conscious Mind) মন বলে। অবচেতন মন ঠিক সময়ে ঠিকঠাক বার্তা সচেতন( Conscious Mind) মনে ধারণ করতে ব্যহত হয়। অবচেতন মন একই সঙ্গে স্মৃতি, বিশ্বাস, আকাঙ্খা, পূর্ব অভিজ্ঞতা, বিচরণকারী বাস্তবতার যেন এক ভান্ডার। সচেতন মনের দ্বারা আমরা কোন সিদ্ধান্ত নেবার চেষ্টা করলেও আমরা সেরাটা বা নির্ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনা। কারণ চিন্তার জন্য আমরা মাত্র ১০%ব্যবহার করি। বাকি ৯০% অবচেতন মন নামক ভান্ডারে ঘর বেঁধে রয়। সচেতন আর অবচেতন মনের যোগ সূত্রই পৌছে দিতে পারে আমাদের সঠিক সিদ্ধান্তের দ্বার প্রান্তে।

The-Centres-of-the-mind

অবচেতন মন আর সচেতন মনের যোগসূত্রের মাধ্যম হল স্বপ্ন। যেহেতু স্বপ্ন তার আপন গতিতে চলে, ইচ্ছে করলেই ইচ্ছে মত স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয়। তাহলে এদের মধ্যে যোগ সূত্রের উপায় কি থাকবে না? না থাকার কথাও তো নয়, উপায়টা হল আমাদের অলস অবস্থাকে অবচেতন মনের রহস্য ভেদ করার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। গবেষক Fehr তার Study of Working Habits এর গবেষণায় দেখিয়েছেন ৭৫% বিজ্ঞানী গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যখন তারা গবেষণা কাজে লিপ্ত থাকেন না।

(মোঃ সোহরাব হোসেন)

চলবে…

Share.

Leave A Reply

2 × = ten