প্রকৃতির অকৃপণ সৃষ্টি জাফলং

0

নতুনকিছু ডেস্ক-

ওপারে খাসিয়া  জৈন্তা পাহাড়, এপারে নদী। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে ঝরনা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি, যেনও পাহড়ে উঠলেই হাতে পাওয়া যাবে ভেসে বেডানো মেঘরাশিকে।

প্রকৃতির এমনই অপরূপ সৌন্দর্যে মোড়া সিলেটের জাফলং। সমতল চা-বাগান, খাশিয়া পল্লি,পানের বরজ সহ এখানে দেখা মিলবে প্রকৃতি ও মানুষের এক সাথে একাত্ব হয়ে যাওয়া সব মনোরম দৃশ্য। জাফলং-এ গেলে শুধুই যে সবুজে ঘেরা পাহাড় দেখতে পাওয়া যাবে, এমনটি নয়। সেখানে গেলে চোখে পড়বে ধলাই ও পিয়াইন নদী দুইটির স্বচ্ছ প্রবাহ। এই স্বচ্ছ জলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় নানা জাতের ছোট মাছ। দুই নদীর পানির নিচ থেকে ডুব দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের পাথর উত্তোলনের দৃশ্যও মুগ্ধ করে পর্যটকদের। নদীর পানিতে নারী-পুরুষের এই ‘ডুবোখেলা’ দেখা যায় ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি। নৌকা ভাড়া করে স্বচ্ছ নদীর বুক দিয়ে ভেসে যেতে যেতেও উপভোগ করা যাবে প্রকৃতির সব মনোরম সৃষ্টি।

শুধু সবুজ আর স্বচ্ছ নদীর দৃশ্য দিয়েই শেষ নয় জাফলং এর সৌন্দর্য। এখানে গেলে চোখে পড়বে, ঝুলন্ত সেতু, যেটি ধলাই ও পিয়াইনের স্বসীমান্তের ওপারে ডাউকি নদীর উপর দিয়ে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে দুলছে। জাফলং-এর অপার সৌন্দর্য, যার টানে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ছুটে যায় সিলেট, এই ঝুলন্ত সেতু তাদের মধ্যে একটি।

এখানে রয়েছে প্রচুর ঝরনা, যেগুলো পাহাড়ের বুক চিরে নিজের অসীম রূপ নিয়ে নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে। কিন্তু তাদের মধ্যে এমন কিছু ঝরনা জাফলং -এর পাহাড় গুলোর বুক চিরে বয়ে চলেছে, যা একবার দেখলে চোখ সরিয়ে নেওয়া খুব কঠিন।

জাফলংয়ের সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে সেখানকার আদিবাসীদের জীবনধারা। নদী পার হলেই খাসিয়াপুঞ্জি। খাসিয়াদের গ্রামকে বলা হয় পুঞ্জি। এই পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা যাবে ৩-৪ ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে  তৈরি খাসিয়াদের ঘর। তাদের জীবন ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস সবকিছুই একটি অন্যরকম আকর্ষন সৃষ্টি করেছে পর্যটকদের কাছে।

ঐতিহাসিকদের মতে বহু হাজার বছর ধরে জাফলং ছিল খাসিয়া জৈন্তা-রাজার অধীনে থাকা এক নির্জন বনভূমি। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে জমিদারী প্রথার বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে খাসিয়া-জৈন্তা রাজ্যের অবসান ঘটলেও বেশ কয়েক বছর জাফলংয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা পতিতও পড়েছিল। পরবর্তিতে ব্যবসায়ীরা পাথরের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌপথে জাফলং আসতে শুরু করেন, আর পাথর ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকলে একসময় গড়ে ওঠে নতুন জনবসতি।

মুক্তি যুদ্ধের সময়ও পাকবাহিনী ও বাংলাদেশের বীর সেনাদের তুমুল যুদ্ধে শত্রুমুক্ত হয় জাফলং। আজ জাফলং বাংলাদেশের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় জানা-অজানা অনেক শহীদের কবরও সংরক্ষিত আছে এখানে।

ইতিহাস ও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য সবমিলিয়ে জাফলং একটি আদর্শ ও আকর্ষনীয় স্থান আপনার একটি ছুটি কাটাবার জন্য। তাই সময় পেলে কিন্তু একবার ঘুরেই আসতে পারেন জাফলং।

 

 

Share.

Leave A Reply

eight × one =