আড়াইশ বছরের পুরনো মঠের গল্প

0

নাফিয়া হাসিন- 

বাংলাদেশের স্থাপত্য শিল্পে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুর অন্যতম। মুন্সীগঞ্জের প্রাচীন নাম বিক্রমপুর। এখানকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে নানান প্রাচীন স্থাপনা। ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুরে পুরাকীর্তি ও স্থাপত্য শিল্পের কথা বলতে গেলে শ্যামসিদ্ধির মঠের নাম অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশের বেষ্টনীতে ঘেরা শ্যামসিদ্ধির মঠটি আড়িয়াল বিলের সৌন্দর্য আরও দ্বিগুণ করে দেয়।

শ্যামসিদ্ধির মঠ বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার শ্যামসিদ্ধি গ্রামে অবস্থিত একটি মঠ। আনুমানিক ২৪৭ বছরের পুরনো এই মঠটি ভারত উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ এবং সর্বোচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ বলে বিবেচিত। শ্যামসিদ্ধি গ্রামের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান শম্ভুনাথ মজুমদার তার স্বর্গগত পিতার চিতার উপরে মঠ নির্মাণের নির্দেশ পেয়ে তার স্মৃতি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য ১৭৫৮ইং এবং বাংলায় ১২৪৩ সালে মঠটি নির্মাণ করেন।

লাল ইটের তৈরী সুউচ্চ মঠটি বাইরের দিক থেকে দেখতে ঠিক অষ্টাভূজাকার। মঠের সমুন্নত চূড়ার ওপর ছিল একটি কলস ও ত্রিশূল। কলসটি ভেঙ্গে গেছে কিন্তু লোহার ত্রিশূলটি এখনো আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে। মঠটির উচ্চতা প্রায় ২৪০-২৪২ ফুট (ভারতের কুতুব মিনারের উচ্চতা ২৩৬ ফুট), প্রত্যেক দিকের বর্গাকার ভূমির দৈর্ঘ্য ২১ ফুট, মঠের ভিতরে ক্ষেত্রফল ৩২৪ বর্গফুট এবং প্রবেশদ্বারের উচ্চতা ২৭ ফুট।

মঠটির গায়ে সোনারং অঞ্চলের কিছু স্থাপত্য কর্মের নমুনা আছে, যা দেখতে ঠিক ফনা বিশিষ্ট সর্পমূর্তি ও লতাপাতার অলংকরণের নকশা দিয়ে সজ্জিত। অষ্টাভূজাকার দেয়ালের প্রত্যেকটিতেই জানালার মত প্যানেল আছে। সেগুলো খোলা যায়না। এই মন্দিরের উপরে দিকে রয়েছে ছোট ছোট বহু ছিদ্র। এই ছিদ্রগুলোকে নিজেদের বাসা বানিয়ে ফেলেছে ঘুঘু, শালিক ও টিয়াসহ নানা জাতের পাখি। তাই মঠটি পাখির কলকাকলিতে সর্বদাই মুখরিত থাকে।

মঠের গায়ের মূল্যবান পাথর এবং পিতলের কলসির এখন আর অস্তিত্ব নেই। এর মূল কাঠামো নকশা করা দরজা জানালা অনেক আগেই চুরি হয়ে গেছে। মঠের ভিতরে ৩ ফুট উচ্চতার কষ্টি পাথরের একটি শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিল, যা ১৯৯৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে চুরি হয়ে যায়। শ্যামসিদ্ধির মঠের এখন কেবল ধ্বংসাবশেষই অবশিষ্ট রয়েছে। জরাজীর্ণ মঠটির নিচের কিছু অংশ সরকারি অনুদানে সংস্কার করা হয়েছে ইট সিমেন্ট বালু টাইলস পাথর দিয়ে। মঠের ভিতরে প্রবেশ করা ভাঙা দরজা জানালাগুলোও লাগানো হয়েছে নতুন করে।

সনাতন ধর্মালম্বী মানুষ এই মঠটি শিব মন্দির বলে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায় বছরে বিশেষ দিনে মঠে শিব পূজা করে। শিব রাত্রিতে পূজা উপলক্ষ্যে মঠের চারপাশ ধোয়ামোছা করা হয়। পূজা উপলক্ষে শ্যামসিদ্ধি হয়ে ওঠে মুন্সিগঞ্জের মিলন মেলা। পুরাকীর্তির ঐতিহ্য বহন করা মঠটি দেখার জন্য দেশ তথা বিদেশ থেকে ও অনেক পর্যটক ছুটে আসেন শ্যামসিদ্ধি গ্রামে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। 

Share.

Leave A Reply

twenty − = 10