পুরান ঢাকার সেকাল-একাল

0

সুমাইয়া জামান–

পুরান ঢাকা একটি ঐতিহ্যবাহী এলাকা। বাংলাদেশের যত পুরানো ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে, তার বেশিরভাগই এই পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করেই। লালবাগ কেল্লা বা আহসান মঞ্জিল, সবই এই পুরান ঢাকাতেই অবস্থিত।

একসময়  এই পুরান ঢাকাই ছিল ঢাকার সকল ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার মূল কেন্দ্র। ঢাকা মূলত গড়ে উঠেছিল বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে। এই নদীটি ঢাকার, বিশেষ করে পুরান ঢাকা তথা সদরঘাটের সকল ইতিহাসের সাক্ষী বহন করছে। বহন করছে ঢাকার জন্মের ইতিহাসও। এই নদীর বুক দিয়েই কত রাজা-বাদশারা ভেসে বেড়িয়েছেন, তৎকালীন সময়ে কত ব্যবসায়িক নৌযান বা জাহাজ দাপিয়ে বেড়িয়েছে বুড়িগঙ্গার বুক দিয়ে। 

পুরান ঢাকার মাটির বুকে কত শত বছর আগে, রাজা-বাদশারা তাঁদের নিজেদের ও তাঁদের প্রজাদের সুবিধার জন্য রাস্তা তৈরি করেছিলেন। সেই রাস্তার উপর টগবগিয়ে ছুটে চলতো ঘোড়ার গাড়ি। যুগ যখন একটু সামনের দিকে এগিয়ে  যায় তারপর সেই রাস্তা দিয়ে চলেছে মোটর গাড়িও। কত মানুষ, কত ইতিহাস আর কত যে ঐতিহ্যে ঘেরা পুরান ঢাকা আর সদরঘাট এলাকা তার হিসাব দেওয়া সত্যিই বেশ কঠিন। 

কিন্তু সদরঘাট বা পুরান ঢাকাতে এখন আর সেই ঐতিহাসিক ঢাকার কোনও চিহ্ন পাওয়া সম্ভব নয়। পুরান ঢাকার রূপ এখন  পাল্টে গেছে সম্পূর্ণভাবে । এই ঢাকাতে এখন আর আগের সেই ঐতিহ্য চোখে পড়বে না। এক সময়ের রাজধানী  ঢাকা এখন পুরান ঢাকা; এক সময়ের ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী এখন একটি দূষিত ও পঁচা পানির একটি মরা নদী মাত্র; একসময়ের রাজার ঘোড়ার গাড়ি বা বাদশা- নবাবের মোটরগাড়ি চলা রাস্তা এখন একটি নোংরা, যানজট পূর্ণ ও মানুষের ঠাসাঠাসিতে ভরা কয়েকটি গলি মাত্র।

সদরঘাট এলাকাতে এখন আর দেখা যাবে না মালপত্র নিয়ে ব্যস্ত জাহাজ বা নৌকাগুলোকে। এখন সেখানে গেলে প্রথমেই নাকে একটি তীব্র পচা গন্ধ পাওয়া যাবে । এই গন্ধ ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গার পচে যাওয়া ঐতিহ্যের। শত শত বছর ধরে ঢাকাকে প্রাণশক্তি যুগিয়ে যাওয়া নদীকে মেরে ফেলা সেই মানুষগুলোর নিশ্বাস থেকে আসা এই গন্ধ নিয়েই প্রবেশ করতে হবে সদরঘাটে।

নদীটির গায়ে তার আব্রু কোনো ঘাস বা গাছপালা সহজে আর দেখতে পাওয়া যাবে না। সেখানে এখন অনেক বড় বড় পাহাড়। পাহাড়গুলো হচ্ছে বুড়িগঙ্গার শ্বাসনালীর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরা হাজার হাজার প্লাস্টিকের। কয়েকটি ছোট লঞ্চ অনাথের মত ভেসে বেড়াচ্ছে বুড়িগঙ্গার মৃত বুকে। কয়েকটি নৌকা হেলে দুলে চলছে স্রোতহীন এই নদীর বুক চিরে।

সদরঘাটের যে রাস্তা একসময়ের সবচেয়ে কোলাহল মুখর থাকতো ব্যবসায়িদের হাকডাকে, সেই রাস্তা এখন হয়ে পড়েছে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের অযোগ্য। সময়ের পরিবর্তনে, যুগের পরিবর্তনে সেখানে লোকসংখ্যা বেড়েছে। রাস্তাজুড়ে এখন আর আগের মত ঘোড়ার গাড়ি চলে না। পরিবর্তিত হয়েছে যুগ; পরিবর্তিত হয়েছে যানবহন, যানবহনের আকার। কিন্তু যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয়নি রাস্তার আয়তন। রাস্তার আয়োতন পরিবর্তিত হওয়ার এখন আর তেমন সুযোগও নেই। রাস্তার একেবারে ধার দিয়েই গড়ে উঠেছে বড়বড় দালানকোঠা ও দোকানপাট।

রাস্তার চলাচলের স্থান সংকুলান না হওয়ার জন্য সেখানে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক যানজট। প্রথমত রাস্তার আয়তন খুবই ছোট, তার উপর রাস্তার পাশেই দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে ট্রাক, পিক-আপ, সিএনজি সহ অনেক যানবাহন। ফলে, রাস্তার আয়তন কমে গেছে আরও অনেক বেশি। মানুষ ও অন্যান্য যানচলাচলে অনেক বেশি বিঘ্ন ঘটছে। শুধু তাই নয়, সদরঘাটের সামনের রাস্তার উপরেই ব্যাগ, জুতা ও বিভিন্ন কাপড় নিয়ে বসেছে কিছু মানুষ। ফলে রাস্তার চলাচলের পথ বেশ ছোট হয়ে পড়েছে। তাছাড়া পথচারীদের চলাচলের জন্য সেখানে ফুটপাতেরও কোনও ব্যবস্থা নেই। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন সকল মানুষ।

পুরান ঢাকাতে সমস্ত জায়গায়ই একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। চলাচলের সমস্ত রাস্তা জুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নোংরা আবর্জনা। প্লাস্টিক, ফলের খোসাসহ বিভিন্ন ময়লা আবর্জনায় ঢেকে রয়েছে সদরঘাটের রাস্তা। রাস্তার পাশে নোংরা পরিবেশে কিছু মানুষ আবার ফলের ব্যবসা নিয়ে বসেছেন। চারদিকে ধুলাবালি ও নোংরার মধ্যেও খাবারগুলোকে কেটে খোলা পরিবেশে  বিক্রি করা হচ্ছে।পুরান ঢাকার আদি ঐতিহ্য বহনকারী সেই আদি স্থাপত্য, আদি ঘর-বাড়িগুলোকে ভেঙ্গে সেখানে তৈরি করা হয়েছে বড় বড় দালান। ঐতিহ্যের কোনও অংশই আর রাখা হয়নি ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য। এই যুগের মানুষদের লড়াই করে যে আদি বাড়িগুলো এখনও টিকে আছে, তারা কোনও সংস্কার বা যত্ন ছাড়াই তীব্র লড়াই করে যাচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য।

তবে এত সব বৈরী পরিবেশের মধ্যেও পুরান ঢাকার পূর্বের সেই নৌ-চলাচল প্রথা কিন্তু এখনও প্রচলিত রয়েছে। বুড়িগঙ্গার তীরে সদরঘাটের সামনে গেলে এখনও চোখে পড়বে অদূরে কিছু ছোট নৌকা নদীর দূষিত কালো অঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে। নৌকাগুলো মানুষ পারাপার করে। ১০-২০ টাকার বিনিময়ে তারা নদীর এপার থেকে ওপারে বয়ে নিয়ে চলে মানুষকে। নদীর কালো জল, নদীপাড়ের রুক্ষ পরিবেশের মধ্যেও নৌকাগুলোর মানুষ পারাপারের দৃশ্যটি এখনও কিছুটা প্রশান্তি এনে দেয় মনে। মনে হয়, এখনও হয়তো কোথাও না কোথাও আমরা আমাদের পূর্বের কিছু অভ্যসকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি।

Share.

Leave A Reply

twenty five + = 31