নারীর মুক্তি কীসে?

0

সজীব সরকার

আধুনিক বিশ্বের অন্যতম একটি ভাবনা হলো নারীর মুক্তির ভাবনা। নারীবাদী আন্দোলন শুরুর পর গত কয়েক দশকে ‘নারীর মুক্তি’ এখনকার অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু নারীর মুক্তি আসলে কীসের মুক্তি? কে দেবে এ মুক্তি? কীভাবে বা কীসে মিলবে এ মুক্তি? এসব প্রশ্নের উত্তর আজও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।

অ্যাকাডেমিশিয়ানদের দৃষ্টিভঙ্গির সমাজতত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, নারীর মুক্তি বলতে এখানে মূলত নারীকে পুরুষের অধীনতা থেকে বের করে নিয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া হয়। অ্যাকাডেমিক তত্ত্ব ও মাঠ পর্যায়ে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বলে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব ক্ষেত্রে নারীকে স্বাধীনতা দিতে হবে; এসব ক্ষেত্রে নারীর ভাবনাকে পুরুষের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেওয়া যাবে না। অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষাসহ নারীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনে পুরুষের কোনো অযাচিত, অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপ বা প্রভাব থাকবে না। কিন্তু এমনটি নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে যা দরকার তা হলো নিজের মন ও শরীরের ওপর নারীর পরিপূর্ণ অধিককারের স্বীকৃতি; বিশেষ করে বাংলাদেশে নারীরা পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র তো দূরে থাক নিজেদের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে পর্যন্ত নিজেদের মতামত বা পছন্দ প্রকাশ করতে পারে না। এমন একটি অবস্থায় বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীর মুক্তির কথা না ভেবে আগে বরং নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে তার পছন্দ-অপছন্দ তথা অধিকার প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করা বেশি জরুরি।

আমাদের দেশের মেয়েদের জীবন একান্তই পুরুষ-নির্ভর; এই ‘পুরুষ’ চরিত্রেরা কখনো তার বাবা, কখনো ভাই, কখনো প্রেমিক বা স্বামী এবং কখনো তার ছেলে(সন্তান) হিসেবে নারীদের জীবনের সবকিছু নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। কী খাবে আর কী খাবে না, কী পরবে কী পরবে না, কোথায় যাবে আর কোথায় যাবে না, ঘর থেকে বেরোবে কি বেরোবে না এই ধরনের যাবতীয় ছোট-খাট কিন্তু জরুরি বিষয়গুলো সবসময় পুরুষেরা নির্ধারণ করে দেয়। এমনকি নারীর সারা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোও যেমন : কাকে বিয়ে করবে আর কাকে করবে না এটিতেও নারীর কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, একজন নারীকেই তার শরীওে সন্তান ধারণ করতে হয় অথচ এখানেও নারীর কোনো মত প্রকাশের সুযোগ থাকে না; সন্তান কখন নেবে বা নেবে না কিংবা কয়টি নেবে বা আদৌ নেবে কিনা। অর্থাৎ একজন নারীর তার নিজের ওপরই কোনো অধিকার নেই : না মনের ওপর আর না দেহের ওপর!

এই যেখানে বাস্তবতা, সেখানে ‘নারীর মুক্তি’ কথাটির একটি মানানসই ব্যাখ্যা আগে দাঁড় করানো দরকার। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এর সর্বজনীন একটি ব্যাখ্যা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু বিদ্যমান সমাজ-বাস্তবতার নিরীখে প্রতিটি সমাজে নারীর মুক্তির বাস্তবসম্মত অর্থ আগে তৈরি ও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমের পরই কেবল আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে বিষয়টিকে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীর সব দেশে নারীদের পিছিয়ে থাকা বা এগিয়ে যাওয়ার চিত্র বা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রত্যাশার ধরন এক ও অভিন্ন নয়। তাই বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটের বিপরীতে স্থানিক পর্যালোচনা ও এর পরই কেবল আন্তর্জাতিক পরিম-লে নিজেদের তুলনা করাই যুক্তিযুক্ত হবে। না হলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর মুক্তি বলতে ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র সব পর্যায়ে নারীর মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর সমান সুযোগ ও অধিকারের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। আর এসব বিষয়ে কাঙিক্ষত পরিবর্তন আনতে হলে সমাজ কিংবা দেশ বদলানোর মতো ভারি কাজ কাঁধে তুলে নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; এজন্যে শুধু নিজের মনোভাবের পরিবর্তন দরকার। প্রতিটি ব্যক্তি যদি শুধু নিজেকে নারী-পুরুষ ইস্যুতে মার্জিত, ভারসাম্যপূর্ণ, সহনশীল, সহানুভূতিশীল, নিরপেক্ষ ও যৌক্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে আর সংঘবদ্ধ সমাজ-বিপ্লবের মতো কষ্টসাধ্য কর্মবিপ্লবের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। অনেকের মধ্যেই জেন্ডার ইস্যুতে ইতিবাচক ও সহনশীল মনোভাব তৈরি ও প্রকাশের চেষ্টা রয়েছে, কিন্তু কর্মকা-ে এর প্রতিফলন দেখা যায় খুব কমই। এর একটি বড় কারণ হতে পারে, জেন্ডার ইস্যু মানুষের মনোজগতে নিতান্তই একটি অ্যাকাডেমিক বিষয় হিসেবে চিত্রিত হয়ে গেছে। এই ইস্যুতে আন্দোলন-বিপ্লবের ধরন এজন্যে অনেকটাই দায়ী। আর এই ইস্যুতে কথা বলার চরিত্রে তাই প্রথাগত পুঁথিগত বিদ্যা-শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকলে এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন সত্যিকার অর্থে হবে না আর হলেও তা টেকসই হবে না। তাই সামষ্টিক আকারে শুধু পুস্তক-নির্ভর কর্মপরিকল্পনার ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করা জরুরি যে, জেন্ডার-ভারসাম্য বা জেন্ডার-সমতা মানে পুরুষ-বিদ্বেষ কিংবা পুরুষ-বিরোধিতা নয়। জেন্ডার ইস্যু শুধু নারীর কোনো বিষয় নয় নারী-পুরুষ উভয়ই এর আলোচ্য ও বিবেচ্য। আর এর সঙ্গে প্রথাগত সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধেরও কোনো বিরোধ নেই। এই বোধ জাগ্রত করা গেলে প্রতিটি ব্যক্তিই এই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে এবং শুধু পরীক্ষার খাতায় লেখা বা সভা-সেমিনারে বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সত্যিকার অর্থেই এই সমতা অর্জনে আন্তরিক হয়ে উঠবে। এতে আর জেন্ডার-সেনসিটিভ হতে গিয়ে কেউ পুরুষ-বিদ্বেষীও হয়ে উঠবে না আর সামাজিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী মনে করে কেউ জেন্ডার-সমতার পক্ষে আন্দোলনের পথে বাধাও হয়ে দাঁড়াবে না।

অর্থাৎ নারীর মুক্তি নিশ্চিত করতে আন্দোলন করার আগে আসলে নারীর মুক্তির ‘মানে’টুকু নির্ভুলভাবে বোঝা এবং কীসে মিলবে সেই মুক্তি সেই লক্ষ্যে নির্ভুল ও উপযুক্ত কর্মপন্থা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।

লেখকঃ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ও গবেষক।

sajeeb_an@yahoo.com

তথ্যসূত্র: womennews24.com (০৫:৪২ এএম, ১২ নভেম্বর ২০১৩ মঙ্গলবার)

Share.

Leave A Reply

− three = five