নানী ছিলো আমার মা, আমার বাবা: পথশিশু

0

(জীবনের প্রথম লেখা উৎসর্গ করলাম জীবনের সেরা উপহার প্রানপ্রিয় মা’কে)

কোথায় জন্মেছি, কবে জন্মেছি কিছুই জানিনা। হয়তো একুশ শতকের কোন এক বছরের ১২তম মাসের অষ্টম দিনে, ঢাকার কোন এক বস্তিতে বা পতিতালয়ে আমার জন্ম। আমি জানিনা কে আমার মা, কে আমার বাবা। আমি জানিনা মায়ের মমতা কেমন হয়। জানিনা মায়ের ভালোবাসা কেমন হয়। কোনদিন মায়ের ভালোাবাসার স্বাদ নেয়া হয়নি। কেউ কি আমাকে বলবে মায়ের ভালোবাসার স্বাদ কেমন হয়? আচ্ছা, মায়ের ভালোবাসায় কি কোন রং থাকে? আমি জীবনে একবারের জন্য হলেও ওই রং ছুতে চাই, পেতে চাই ওই স্বাদ।

আমি মাসের অষ্টম দিনে জন্মেছি বলেই কি মায়ের ভালোবাসার স্বাদ থেকে বঞ্চিত? আমি পতিতালয়ে জন্মেছি বলেই কি মায়ের ভালোবাসার স্বাদ থেকে বঞ্চিত.? মায়ের ভালোবাসা না পাওয়ায় আমার হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, আমার বুকটা যে কষ্টে ফেটে যাচ্ছে, হে আল্লাহ তুমি কি দেখতে পাওনা? আমার আকুতি কি শুনতে পাওনা? আমি জানিনা বাবার শাসন কেমন হয়। কোনদিন অনুভব করার সুযোগ হয়নি বাবার শাসনের আড়ালের ভালোবাসা। আচ্ছা, বাবারা তো মেয়েদের অনেক ভালোবাসে। আমিও তো একটা মেয়ে। আমার বাবা কেন আমায় ভালোবাসে না? আমার বাবা কেন আমার খোঁজ নেয় না? তার শূন্যতা যে আমাকে কষ্ট দেয় তা কি সে বোঝেনা? আমার আকুতি কি তার হৃদয়ের গভীরে আঘাত করেনা?

আচ্ছা, কেউ কি আমাকে বলবে, বাবারা কেমন হয়? তারা কি খুব গম্ভীর হয়? জীবনে একবার হলেও বাবার শাসনের আড়ালের ভালোবাসা কে খুজতে চাই। আমার কোন ভাই বোন নেই। জীবনে কোনদিন পাওয়া হয়নি ভাই বোনের ভালোবাসা, আদর, স্নেহ। শুনেছি এই স্বার্থের পৃথিবীতে ভাই, বোনই প্রকৃত বন্ধু। শুনেছি, একটা বড় ভাই থাকা মানে দুই জন বাবা থাকা। শুনেছি একটা বড় বোন থাকা মানে দুইজন মা থাকা। আমার কোনদিন এই ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি। হবে কিভাবে, আমি তো ১২তম মাসের অষ্টম দিনে জন্মেছি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে আমি মাসের অষ্টম দিনে জন্মেছি, নবম দিনে না।

তাইতো আমার জীবনে কোনকিছু না থাকার পরও একজন নানী ছিলো। এই নানীর সাথে আমার রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। তবে অন্য একটা সম্পর্ক আছে, আত্মার সম্পর্ক। আমার জীবনের সমাপ্তি হয়তো ওই ডাস্টবিনে শেষ হতো। আল্লাহই হয়তো নানীকে পাঠিয়েছিলো আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে, সভ্য পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা দেখতে। আমার কাছে এই নানী ছিলো আমার মা, আমার বাবা। তার ঘামে ভেজা হাতের পরশ আমাকে শান্তি দিতো, আমাকে মায়ের ভালোবাসার স্বাদ দিতো। তাঁর লোক দেখানো রাগ আমাকে বাবার শাসনের আাড়ালে ভালোবাসাকে খোঁজার সুযোগ করে দিয়েছে।

আমার কাছে সুখ বলতে তার ক্লান্ত শরীরের ঘামে ভেজা চেহারার পানে লাল করা ঠোটের মিষ্টি হাসি। ফুটপাতে চাদের আলোয় নানীকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোয় যে কি একটা আনন্দ, কি যে একটা প্রশান্তি তা শুধু আমার আল্লাহই জানে। আমার কাছে নানীর শরীরের গন্ধই বসন্তের ফুলের গন্ধ। হাইকোর্ট মাজার প্রাঙ্গনে আমার বেড়ে ওঠা। হাইকোর্ট মাঠে আমার পদচারণা। আমার মতো মাসের অষ্টম দিনে জন্ম নেয়া বাচ্চাগুলোই আমার ভাই বোন। ওদের সাথেই আমার দুষ্টোমি।

আমার লেখাপড়ার হাতেখড়ি Save The Future এর হাতে। Save The Future এর ভাইয়ারা, আপুরা অনেক সুন্দরভাবে কথা বলতো, অনেক সুন্দর সুন্দর বিষয় শেখাতো। আমাদের খেতে দিতো, ঈদে নতুন জামা কিনে দিতো। এই প্রথম সভ্য পৃথিবীর কেউ সপ্তাহের অষ্টম দিনে জন্ম নেয়া শিশুদের বুকে টেনে নিলো, আমাদের জন্য ভালোবাসার হাত এগিয়ে দিলো। দিনগুলো অনেক সুখময় ছিলো। আমি যে মাসের অষ্টম দিনে জন্মেছি, এত সুখ কি সইবে আমার কপালে! সেই শুক্রবারের সকাল টা অন্যরকম ছিলো আমার কাছে।

প্রতি রাতের মতো নানী কে জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম থেকে ওঠে আর নানী কে পাইনি। এই প্রথম একটা শূন্যতা অনুভব করলাম। সবার কাছে শুনলাম নানী হাসপাতালে, তাঁর অনেক দিন ধরেই ক্যান্সার। আর কয়েকদিন বা কয়েকটা ঘন্টা হয়তো বাঁচবে। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো, আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হয়নি। আমি চিৎকার করে কাঁদতে চেয়েছিলাম, এতটা জোরে চিৎকার করে কাদতে চেয়েছিলাম যেন ওই আকাশ ফেটে যায়, যেন ওই আরস কেঁপে ওঠে।

আমি যখন হাসপাতালে পৌঁছেছিলাম নানী তখন জীবনের শেষ নিশ্বাষ নিচ্ছিলো। আমার চোখের সামনেই নানী আামাকে ছেড়ে চলে গেছেন। শেষ বারের মতো কিছু বলে যায়নি আমাকে। শেষ বারের মতো কিছু বলতে পারিনি নানীকে। নানী জানো, আমার না খুব কষ্ট হয় তোমাকে ছাড়া। আমি জান্নাতে আল্লাহর কাছে শুধু তোমাকেই চাইবো। তিনি যেন আমাকে সব সময় তোমার শরীরের গন্ধ নিতে দেয়, যেন তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে দেয়। নানী, আমার না খুব ভয় করে একা ঘুমাতে। নেশাখোর শকুনেরা কেমন করে যেন তাকায়। নেশাখোর শকুনেরা ওদের কাম বাসনা আমাকে দিয়ে পূরণ করছে। ওরা কীভাবে পারলো নয় বছরের একটা মেয়ের সাথে এমনটা করতে? ওরা আমার মুখ বন্ধ করে রেখেছিলো। আমি চিৎকার করতে চেয়েছিলাম। এত জোরে চিৎকার করতে চেয়েছিলাম যেন সাত আসমান ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। চিৎকার করে আল্লাহর কাছে জানতে চাইতাম, সে কি অন্ধ? সে কি আমার কষ্ট দেখেনা! আমার হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা কি সে দেখে না? এখন আমার এক নতুন পরিচয় হয়েছে, আমি ধর্ষিতা।

লেখক: নাঈম, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কৃতজ্ঞতা: Save the Future

Share.

Leave A Reply

÷ 2 = four