ঢাকার বুকে এক টুকরো সমুদ্র

0

সুমাইয়া জামান-

সমুদ্র শব্দটি আসলেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে কক্সবাজার কিংবা সেন্ট মার্টিনের অশান্ত জলরাশি, প্রবল বাতাস আর দিগন্তে আকাশ ও পানির একত্রিত হয়ে যাওয়ার স্বর্গীয় দৃশ্য। তবে, সমুদ্রের যে রূপটি মানুষকে বারবার টেনে নিয়ে যায় সমুদ্র সৈকতে, তা হলো দিগন্তে আকাশ ও পৃথিবীর সন্ধিস্থল।

তবে, এবার কিন্তু আকাশ ও পৃথিবীর মিলনকে উপভোগের জন্য মানুষকে ছুটে যেতে হবে না সুদূর সমুদ্র সৈকতে। ঢাকার বুকেই এবার দেখা মিলবে এক টুকরো সমুদ্রের।

গতকাল (২১ অক্টোবর)  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সম্মানিত উপদেষ্টা রোবায়েত ফেরদৌস স্যারের সাথে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষক মুহাম্মাদ মাছুদ চৌধুরী স্যারের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগদান করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই হাকিম মাহি দাদার । স্যারের জন্মদিনের অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সারির ফাইভ স্টার হোটেল ‘লা মেরিডিয়ানে’ যেটি ঢাকার খিলক্ষেতের পাশে বিমানবন্দর রোডে অবস্থিত।

যখন সেখানে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এসেছে। লা মেরিডিয়ান সবমিলিয়ে ১৬ তলা  বিশিষ্ট একটি ভবন। প্রবেশ পথেই দেখতে পেলাম সেখানে কয়েকটি কৃত্রিম ঝর্ণার দৃশ্য দ্বারা স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে অতিথিদের। হোটেলের ভেতর প্রবেশের জন্য রয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। ভবনের ভেতর প্রবেশের পর তাঁর ভেতরের সাজসজ্জা ও বিভিন্ন রঙের আলোর মিশ্রণ আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে তুলছিলো।

লিফটে করে পৌঁছলাম ভবনের ১৫ তলায়। স্যার আমাদেরকে সেখানের একটি রেস্টুরেন্ট ‘ফেবুলা’য় নিয়ে গেলেন। রেস্টুরেন্টের ভেতর প্রবেশ মাত্রই আমার মনে হলো আমি হয়তো আর বাংলাদেশের মাটিতে নেই। কোন এক অলৌকিক শক্তির টানে চলে এসেছি পৃথিবীর অন্য কোন এক প্রান্তে। আমার চারদিকে তখন অস্থানিক বা বহিরাগত সাদা চামড়ার মানুষের ভিড়। তাঁরা তাঁদের মতো সন্ধ্যার খাবার উপভোগ করছেন এবং  তাঁদের মতো হাসছেন, কথা বলছেন, যেন তাদের নিজেদেরই আবাস্থল এটি।

আমরা সম্পূর্ণ কাঁচে ঘেরা একটি জানালার পাশে গিয়ে বসলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমাদের টেবিলটি সামান্য কাঁপছে। প্রথমে ভাবলাম ভূমিকম্প হচ্ছে না তো ! মনে মনে বেশ একটু ভয়ও পেলাম। ভাবলাম ,ভূমিকম্প হলে এতো উঁচু ভবন থেকে নামবো কীভাবে? স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে স্যার যেটি বললেন তা হলো, এই ভবনটিই এয়ারপোর্টের প্রায় পাশেই তৈরি। বিমান ফ্লাই করলে বা টেক অফ করলে তাই ভবনটি কাঁপে।

স্যারের কথা শুনে অবাক আর কৌতূহল মন নিয়ে জানালার কাছে গেলাম। আমি ও মাহি দা নির্বিকার। দু’জনের মুখেই কোন কথা নেই। আমরা দেখছি একটির পর একটি বিমান কীভাবে নামছে, উঠছে! যেন জীবনের অন্যরকম এক স্বাদ পেলাম।

মাসুদ চৌধুরী স্যার তখনও আসেন নি। তাই রোবায়েত স্যার আমাদেরকে নিয়ে গেলেন ১৬ তলায়। সেখানে লিফট থেকে নামার পরই কানে ভেসে এল পানির কলকল শব্দ। একটু অবাক হলাম! এতো উপরে পানির শব্দ! তখনও জানি না যে কী চমক অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য।

ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম সিঁড়ির দুই পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে পানির তীব্র স্রোত। সিঁড়ির নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে রং বেরঙের পাথুরে নদী। যার উপর কাচের ব্রিজ তৈরি করে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। তারপর যে দৃশ্য দেখলাম, তা ভাষায় বর্ণনা করা আমার পক্ষে আসলেই বেশ কষ্টসাধ্য।

চোখের সামনে সামান্য একটি সুইমিংপুল। কিন্তু তার গঠনগত দিক তাকে করে তুলেছে অতুলনীয়। সুইমিংপুলের এক পাশে সৈকতের মতো বিস্তৃত পাড় আছে, কিন্তু অন্যপাশের পাড় বিহীন জায়গাটিকে যেন উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে ঢাকার শূন্য বায়ুমন্ডলে। তার এক একটি প্রান্ত যেন অনন্ত আকাশের এক একটি প্রান্তের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সুইমিংপুলটির নীল পানি আর রাতের সীমাহীন রঙিন ঢাকা, যেন একে অন্যের সাথে আলিঙ্গনে মেতে আছে।

দৃশ্যটি আমার মনে যে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা বলে বোঝানো আমার পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব। আমাদের জন্য যে আরও একটি বিশাল চমক অপেক্ষা করছে, তা বুঝলাম সুইমিংপুলের ঘোর কাটার পর। স্যার আমাদেরকে  সুইমিংপুলটির ধার দিয়ে হেঁটে যেতে বললেন এবং তাঁর এক প্রান্তে থাকা রেলিং দিয়ে বাইরে দেখতে বললেন।

আমরা বাকরুদ্ধ। আমাদের সামনে এক অন্য ঢাকা। আমরা দেখছি, রাজধানীর গলায় এক রঙ্গীন নেকলেস। এটি আর তেমন কিছুই নয়। শুধু একটি রাস্তার বাক মাত্র। যেখানে অসংখ্য রঙ্গীন আলো ছড়িয়ে পরিবহনগুলো চলাচল করছে। আর তাতেই মনে হচ্ছে ঢাকা নিজেকে চলমান রঙের নেকলেস দিয়ে সাজিয়েছে। তাঁর চারদিকে অগণিত লাল, নীল, সবুজ আলো। এগুলো ঢাকার আকাশচুম্বি দালানগুলো থেকে আসছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ রঙ্গীন জোনাকি ঘিরে ধরেছে আমাদের চারদিক। যারা ঢাকাকে যানজটের শহর বলেন, তাঁরা ঢাকার এই রঙ্গীন যানজটকে দেখে ক্ষণিকের জন্য হলেও বিমোহিত হবেন।

মনে মনে রোবায়েত স্যারকে যে কত শতবার ধন্যবাদ দিয়েছি, তার হিসাব হয়তো আমার নিজেরও অজানা। তাঁর জন্যই আজ আমরা এমন কিছু মন্ত্রমুগ্ধকর অনুভূতির সামনা- সামনি হয়েছি, যা হয়তো আর কখনো হওয়ার সুযোগ হবে না। আসলেই রোবায়েত ফেরদৌস স্যারের যে শিক্ষার্থী তাঁর সান্নিধ্য পায়নি, তার জীবনের অনেকটা অংশই অপূর্ণ রয়ে গেলো।

আমরা নিচে নামলাম।  মাছুদ চৌধুরী স্যার চলে এসেছেন। আমি এবং মাহি দা তাঁকে দোলনচাঁপা ফুল দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম। আমরা পরিচিত হলাম আর এক অসাধারণ মানুষের সাথে। আমাদের সাথে যে তিনি আজ প্রথম মিলিত হয়েছেন, তা তাঁর ব্যবহারে বোঝাই কষ্টকর। তিনি আসলেই এক অতুলনীয় মানুষ।

আমরা এই দুইজন শ্রেষ্ঠ মানুষের সাথে রাতের অসাধারণ খাবার শেষ করে রওনা হলাম বাড়ির দিকে। আমরা ফিরছি। কিন্তু সাথে করে নিয়ে এলাম এমন কিছু অনুভূতি, যার সাথে আমাদের সারাজীবনের কোনো অনুভূতিরই তুলনা চলে না। সত্যি এক অভূতপূর্ব সন্ধ্যা কাটিয়ে এলাম অতুলনীয় মানুষদের সাথে ‘লা মেরিডিয়ানে’।

Share.

Leave A Reply

seventy two − sixty seven =