ডুব দিয়ে উঠলাম

0

দুইদিন আগে দেখে ফেললাম মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বহুল আলোচিত- সমালোচিত সিনেমা ডুব। এই সিনেমা রিলিজ পাওয়ার আগেই যে ঘটনা ঘটে গিয়েছিলো যে, আমি একপ্রকার ধরেই নিয়েছিলাম এই সিনেমা আর যাই হোক ফ্লপ যাবে না। ট্রেলারটি দেখে যেহেতু হুমায়ুন আহমেদ এর সঙ্গে মিল পেয়েছিলাম তাই সিনেমাটি দেখার আগ্রহ আরো বেড়ে গিয়েছিলো। কিন্তু রিলিজ হওয়ার পর থেকে যে পরিমানের নেগেটিভ রিভিউ পড়েছি মনে আশঙ্কা তৈরি হয়ে গেলো। দেখবো নাকি দেখবো না? এরপরও হুমায়ুন আহমেদ এর প্রতি ভালোবাসার জন্যই সিনেমাটি দেখতে যাই। প্রথমেই বলে নেই আমি সদা সত্য কথা বলবো এক বিন্দুও বাড়িয়ে কমিয়ে বলবো না।

সিনেমাটি শুরু যেখানে হয় শেষও সেখানেই হয়। ইরফান খান যখন পরিবার নিয়ে বান্দরবন ভ্রমণে যান দর্শক হিসেবে একটু আশা জন্মে, হয়তো নতুন কিছু দেখবো। দেখলাম, কি সুন্দর লোকেশন, কি সুন্দর পরিপাটি পোশাক-আশাক সবকিছু। চোখের শান্তি লাগছিলো। কিন্তু বেশিক্ষণ না। তবু আমি শেষ পর্যন্ত ভেবেছি হয়তো নতুন কিছু দেখবো। নতুন কিছু দেখিনি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম এই সিনেমা দেখে আমি মুখ লুকিয়ে কাঁদবো। পারিনি! তবে হ্যাঁ, ইন্ডিয়ান হিসেবে ইরফান খুব চেষ্টা করেছে শুদ্ধ বাংলা বলার। কথায় কথায় ইংলিশ বলে বাংলা বলা এড়িয়ে দেয়া খুব চোখে পড়ছিল।

ভালো লাগার দিক গুলো বলতে গেলে বলবো, কিছুকিছু ফ্রেমিং খুবই ভালো লেগেছে। বিশেষ করে সাবেরি আর নিতুর বড়বেলা থেকে ছোটবেলায় যাওয়ার ফ্ল্যাশব্যাকটি। নিতুকে যখন জাভেদ সাহেব এড়িয়ে যাচ্ছিলো, তবু নির্লজ্জের মতো জাভেদ সাহেবের বাড়ির নিচে গাড়ি নিয়ে বসে থাকে সে। ঠিক তখন হঠাৎ করেই গাড়ির ছাঁদে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্যটি মনে নাড়া দিয়েছে ভালোই। সাবেরির মা মায়ার জন্মদিন যখন কাশফুলে ঘেরা প্রকৃতির মাঝে পালন করা হয়। তখন প্রকৃতির যে একটি খেলা দেখিয়েছে তা খুব ভালো লেগেছে। বাতাসের মাঝে দুলেছে আমার মনও। নিঃশব্দটা এবং প্রকৃতি নিয়ে সুন্দর মতন খেলেছেন পরিচালক। সিনেমাটোগ্রাফি এবং আবহসঙ্গীত আপনার চোখ ও মনকে শান্তি দিবে। কোনোপ্রকার নোংরা ডায়লগ নেই। “তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না মরে যাবো” টাইপ কোনো ঘটনা ঘটবে না। মেয়ের চরিত্রে তিশা খুব ভালো অভিনয় করেছেন। চরিত্রের সঙ্গে জাস্টিস করেছে। বাবার প্রতি তাঁর খুব ক্ষোভ কিন্তু ভালোবাসাটাও অনেক বেশী। জাভেদ সাহেবকে পানি এনে দেয়ার দৃশ্য প্রকাশ পায় বাবার প্রতি তাঁর মায়া ও ভালোবাসা। মায়ের চরিত্রে রোকেয়া প্রাচীর অভিনয়ের আরো জায়গা করে দেয়া উচিৎ ছিল। তবে হ্যাঁ, তাঁর নিঃশব্দটা প্রকাশ পেয়েছে মনের গভীরে তাঁর কতো কষ্ট লুকিয়ে আছে। যা চিৎকার করে বলে বোঝাতে হয় না। চাপা কষ্টের দাগ বেশী গাড় হয়। নিজের স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ পেয়েও সে যে নিশ্চুপ ভাবে সয়ে গেছে মনে হয়েছে, জাভেদ সাহেব তো সেই কবে থেকেই তাঁর কাছে মৃত ছিল আজকে শুধু সংবাদটি এসেছে। নিতু চরিত্র নিয়ে সমাজে আবারও ভুল ধারণা তৈরি হবে যে মেয়েরাই খারাপ থাকে। ইরফান খানকে নিয়ে বলার আর কিছুই নেই।

যদি জোর করে নিজে কিছু শিখতে চাই তাহলে বলবো শেখার মতো আছে শুধু একটি ব্যাপারই সেটি হলো প্রিয়জনদের সাথে কখনোই সব কথা শেষ করে দিবেন না। কিছু কথা সবসময় বাকি রাখবেন। প্রিয়জনদের অবহেলা করবেন না। প্রিয়জনরা সব সহ্য করতে পারে কিন্তু অবহেলাটি কখনই সহ্য করতে পারে না। মুখে বলে না, ভেতরে রাখে। একা একা কষ্ট পায়।

যাইহোক, এই সিনেমাটি পুরো ব্যাপারটি যা নিয়ে আগে বেড়েছে সেটা হচ্ছে মিড লাইফ ক্রাইসিস নিয়ে। সংসার ধর্ম আর ভাল্লাগে না টাইপ। পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি, এক পর্যায় একা থাকার সিদ্ধান্ত।

খারাপ লাগার দিক গুলো হচ্ছে, অনেক চেষ্টা করেও ভালো লাগাতে পারিনি একই দৃশে অনেকক্ষণ ধরে ফ্রেম ধরে রাখাকে। আমি অবশ্যই ফিল্ম মেকিং নিয়ে বেশী কিছু বুঝি না। কিংবা আমার মতো যারা সিনেমা দেখবে তারাও বুঝে না। দর্শক ফ্রেমিং বুঝে না, বুঝে না শটস। দর্শকের কাছে সবচে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপার তা হচ্ছে গল্প যা এই সিনেমাতে নেই। দুঃখজনক হলেও এটিই সত্য। খুবই অসমাপ্ত অপরিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। প্রথমবারের এবং শেষবার যখন নিতু ও জাভেদকে কাছা-কাছি দেখানো হয়েছে ঠিক এরপরের দৃশে হঠাৎ করেই জাভেদ সাহেবের মৃত্যু দেখানো হয়েছে। তড়িঘড়ি করে দাফন দেখিয়ে যতো দ্রুত সম্ভব সিনেমা শেষ করে দেয়া হয়েছে।

যদি আপনি হুমায়ুন আহমেদের গল্পে তৈরি সিনেমা দেখতে চান তাহলে ভুল হবে। কারন হ্যাঁ, এটি উনার বায়োপিক নয়। কারন হুমায়ুন আহমেদ একজনই। অনেক চেষ্টা করেও সিনেমাটির প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে পারিনি। সিনেমা দেখে বের হয়ে বেশীরভাগ মানুষই বিরক্ত ছিল। ছন্নছাড়া একটি সিনেমা যার নাম ডুব। আহারে জীবন!

Share.

Leave A Reply

37 − thirty six =