ছিনতাইকারীকে নয়, ছিনতাইয়ের কারণকে ধরতে হবে

0

সুমাইয়া জামান-

সন্ধ্যা ৭ টা। মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে লোকজন ছোটাছুটি করছে যে যার ব্যাস্ততা নিয়ে।  হঠাৎ দেখি একটি ছেলে উর্ধ্বশ্বাসে সামনের দিক দৌড়ে যাচ্ছে। ছেলেটার গায়ে একটা ছেড়া কালো রঙের গেঞ্জি, মাথার চুল উসকো খুসকো, একটা কেমন যেনও দরিদ্র দরিদ্র ভাব চেহারার মধ্যে।

ছেলেটা দৌড়াচ্ছে আর তার পেছনে আরও কতগুলো লোক ওকে ধরার জন্য প্রাণপণে ছুটছে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না প্রথমটায়। পরে ওই লোকগুলো ফিরে আসার পর তাদের মধ্যে একজন বলছে, ” শালা পালিয়ে গেলো। ধরতে পারলে একেবারে হাড় মাংস এক করে দিতাম।”

খানিক পর জানা গেলো ছেলেটা একটা মেয়ের ব্যাগ ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে পালিয়ে যাচ্ছে। যদিও ব্যাগটা নিতে পারে নি সে। আমার আশেপাশে যেসব মানুষগুলো ছিলো, তারাও বলতে লাগলেন, ‘ইস ধরতে পারলেন না! ব্যাটার হাত ভেঙে দেওয়া উচিত ছিলো’। এমন আরও অনেক মানুষ অনেক রকম বলছেন।

এমন পরিস্থিতিতে যে ই সেই জায়গায় থাকবেন, সে ই এমন ধরণের মন্তব্য  করবেন আর এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যিই কী এটাই স্বাভাবিক?

কোনও মানুষ কারণ ছাড়া কোনও কাজ কখনও করে না। ছেলেটা ধরা পড়লে কি হতো? প্রথমেই সাধারণ মানুষ তাকে ইচ্ছা মতো মারতো। তারপর পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গিয়ে আরও এক  দফা পেটাতো। তার জেল হতো, তারপর জেল থেকে বেরিয়ে যেতো।

কে বলতে পারে,যে ছেলেটি জেল থেকে বের হয়ে গেলো, সে আবারও জেল থেকে বেরিয়ে এই একই কাজ করবে না। হয়তো জেল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ই পথে একটা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটাবে। তাহলে কি লাভ হলো এই আইন প্রয়গে? কী লাভ হলো ওই ছিনতাইকারীকে এতো মারধর করে? যে উদ্দেশ্য নিয়ে এতো সব, সেটা কি প্রকৃতপক্ষে পূরণ হলো?

আমরা প্রত্যেটি মানুষই ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলি । তার সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য দাবি করি। ছিনতাইকারীকে রুখতে চাই। কিন্তু কেউ কি ছিনতাইকে রুখতে চাই?

আমি ছিনতাইয়ের পক্ষে কখনোই নই। কিন্তু ছিনতাইয়ের কারণগুলোকে উপেক্ষা করে, ছিনতাইকারীর ছিনতাই করার উপায় গুলোকে বন্ধ না করে, শুধু লাঠি আর বন্দুক নিয়ে ছিনতাইকারীর পেছনে দৌড়ালে, তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেই ছিনতাইকে বন্ধ করা কী আসলেই সম্ভব?

একজন মানুষ বিভিন্ন কারণে কোনো অন্ধকার জগতে পা রাখে বা রাখতে বাধ্য হয়। কেউ ইচ্ছা করে, কেউ মাদকের জোগান জোগাতে আবার কেউ বা অভাবে পড়ে বাধ্য হয়ে বা এই ধরণের কাজে লিপ্ত হয়। এছাড়াও আরও অনেক ধরণের কারণ আছে এই জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ার। সবগুলো কারণকে যদি ভালোভাবে বের করে তা নিরসন করা সম্ভব হয়, চারপাশে যদি ছিনতাই করার কারণই না থাকে তাহলে ছিনতাইকারীই আর থাকবে না।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, যারা অভাবে পড়ে ছিনতাইকারীর দলে নাম লেখান, তারা আসলে ইচ্ছা করেই এটা করে। বাংলাদেশে কি ইনকামের পথের অভাব আছে? বাদাম বেচে কিংবা যে কোনো উপায়েইতো টাকা ইনকাম করা যায়, এর জন্য আবার ছিনতাইয়ের মতো কাজে নামতে হয় নাকি !

এটা সত্য যে বাদাম বেচে কিংবা অন্য যে কোনো নিম্ন উপায়েই সম্ভব যে কোনো উপায়ে নিজের সংসার চালিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো, রাস্তায় বা যেকোনো জায়গায়ই আপনি কয়দিন রাস্তার বাদামওয়ালার থেকে বাদাম কিনে খেয়েছেন? বা যারা ফুটপাথে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে বসেন, তার থেকে কতদিন আপনি কিছু কিনে এনেছেন?

যারা মাদকাসক্ত, মাদকের যোগান যোগানোর জন্য অন্যের সম্পদ হাতিয়ে মাদকের টাকার জোগানের ব্যবস্থা করে, তারা মাদক পায় কোথায়? যারা মাদক বেঁচে তাদেরকে উৎখাত করতে পারলেই মাদকের চাহিদা থাকবে না। যারা মাদক সেবন করে, তাদেরকে সতর্ক করে বা যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়ে এই পথ বন্ধ করা সম্ভব। আর এর জন্য শুধু সরকার বা পুলিশের উপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষক সকলকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এই ক্ষেত্রে।

এমন অনেক কারণই আছে যেগুলোর জন্য ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা দিনদিন বেড়ে চলেছে। সেই কারণ গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই আর লাঠি বা বন্দুক নিয়ে ছিনতাইকারীর পেছনে ছুটার প্রয়োজন হবে না। আর এর জন্য শুধু সরকার বা প্রশাসনের উপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। পরিবার থেকে শুরু করে সকলকে সমানভাবে অবদান রাখতে হবে বাংলাদেশ থেকে শুধু ছিনতাইকে নয়, অন্য যে কোনো উন্নয়নের প্রতিবন্ধক কর্মকান্ডকে দূর করতে।

 

Share.

Leave A Reply

− two = seven