চিড়িয়াখানার বদ্ধ খাঁচায় এখন পাখির স্বাধীনতা

0

পর্ব-৩

বেশ কিছুদিন হল আবিদ চাপা ফুলের গন্ধ পাচ্ছে, কোথা থেকে হাওয়ায় ভেসে এসে তার নাকে লাগছে সেই মনোরঞ্চিত শোভাস, সে সম্পর্কে জানেনা আবিদ। তবে সে খুঁজে ফিরে সেই শোভাসের উৎসকে, যেথা থেকে তার উতপন্ন। শহরে হাতেগোনা দুই একজন মানুষই চাপা ফুল পছন্দ করে কারো বাড়ির উঠোনে, কিংবা ছাদের টবেও চাপার দেখা মেলে। এ ফুল আজকাল বড়ই দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে, কিন্তু মাতাল করা ঘ্রাণ আবিদ কিছুতেই ভুলতে পারছেনা।

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে আবিদ সন্ধ্যার আলো গায়ে মাখবে বলে। প্রতিটি সন্ধ্যা আবিদের কাছে নতুন এক বারতা বয়ে আনে, পৃথিবীকে দেখে মনে হয় আবারও নতুনরূপে জন্ম নিয়েছে এই ধরণিকে সাজাবে বলে। বেলকনির এক কোণে একটি চড়ুই পাখি বাসা বেধেছে থাকার জন্য এ বাড়ির কেউ সে কথা জানেনা শুধু আবিদ ছাড়া।আবিদের চোখ খুব সুচালো তীক্ষ্ণ কোন কিছুই তার চোখ এড়িয়ে আড়াল হতে পারে না। এখানে একজোড়া চড়ুই ছিল রেলিং এ বসে খেলা করতো, আবার কখনো শূন্য আকাশে উড়াল দিতো তার বলিষ্ঠ ছোট্ট দুটি পাখা মেলে।

পাখি হয়ে জন্মালে খুবই ভাল হতো ভাবে আবিদ।পাখিদের মধ্যে কোন রকম কলহ বিবেদ নেই, আছে প্রশান্তির ছায়া। সারাদিনের আহারের পর তারা ক্লান্তি দূর করতে সন্ধ্যায় নীড়ে ফিরে এসে শান্তির ঘুম ঘুমায়। কেউ তাদের বিরক্ত করেনা, তারাও কাউকে বিরক্ত করতে যায়না। আবিদ ভাবে ইশ আমার যদি পাখির মত পাখা থাকত কতইনা ভাল হত! ইচ্ছে খেয়াল খুশিমতো আকাশে উড়ে যেতাম ডানা ঝাপটিয়ে আবার ক্লান্ত হলে ফিরে আসতাম আপন ভুবনে।

আবিদ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা পাখিদের কি ক্লান্তি আছে? আমার মনে হয় নেই। তারা ইচ্ছে করলে সারাদিনমান আকাশে উড়ে উড়ে ভেসে ভেসে বেড়াতে পারে। আমার পাখা থাকলে নিশ্চয় আমারও কোন ক্লান্তি হতো না। আমি দূর আকাশে মেঘের কাছে চলে যেতাম মেঘকে স্পর্শ করে দেখার জন্য। মেঘ এতো কালো হয় কেন? গুড়ুম গুড়ুম শব্দ হয় বাজ পড়ার মতো। মেঘের সাথে খেলা করতে করতে এক সময় মেঘকেই বন্ধু করে নিতাম, থেকে যেতাম তার কাছে। কেননা পৃথিবীর মানুষগুলো এখন আর মানুষ নেই, হয়ে গেছে পিশাচসিদ্ধ এক দুষিত নগরী বাসিন্দা।

পৃথিবীকে এখন ব্ল্যাক ম্যাজিকের দেশ বলে মনে হয়। এখানে রোজই মানুষ মানুষের কাছে প্রতারিত হচ্ছে নানান ভাবে। অসৎ পথের ঘাঁটি হয়ে গেছে এখন পুরো সমাজ ব্যবস্থায়। চাকরির বাজারে চাকরি নেই, বেকারত্ব বেড়েই চলেছে, কোন সুরাহা নেই। বাবা মা’র মুখে হাসি ফুটাবো তার ক্ষমতাও নেই। আছে কেবলই হতাশা আর মানুষের বিদ্রুপ পরনিন্দা। মানুষ সমালোচনা করতে ভালবাসে আড়ালে আবড়ালে ও জনসম্মুখে। পাশে দাঁড়িয়ে ভরসা দেবার লোক নেই পেছনে দাঁড়িয়ে পথ এগিয়ে যেতে বলবে এমন লোক নেই। আছে কেবল মানুষ মানুষকে কলঙ্কিত করার মতো কুলষিত সমালোচিত মানুষ। মানুষ এতে আনন্দ পায়।

আমিও কি সমালোচনার স্বীকার হইনি! ভাবলো আবিদ। আমি পাখির মতো ডানা পেলে ঘর বাধতাম গাছের ডালে। ঘর হত পাখির মত কুড়েঘর। এখানে সবাই সমান, বড়াই করার কিছু থাকতো না। মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে বসে থাকতে হতো না। আচ্ছা, পাখিরা কি আমাদের দেশে, দেশের মানুষের কাছে নিরাপদ, তারা কি তাদের স্বাধীনতা পায় এই দেশে বসবাসের জন্য? নাকি তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে! এসময়ে ইচ্ছে করলে আকাশে তাকালেই পাখি দেখা যায়না। যা দেখা যায় দু’ একটা উড়োজাহাজ, সেটাও একটা ককপিট পাখি। চিড়িয়াখানার বদ্ধ খাঁচা ছাড়া এখন আর পাখির সান্নিধ্য মেলে না। হঠাৎ কারো গলার আওয়াজ ভেসে এল বেলকনিতে। কমলা এসেছে হাতে চায়ের কাপ। আবিদ জিজ্ঞেস করলো কে কমলা?
সরল উত্তর করলো কমলা, জী ভাইজান।
আবিদ জানে বাড়ির সব থেকে কোনার দিকের এই ঘরে কমলা ছাড়া আর কেউ আসেনা। অনেকে এই ঘরের পথ চিনতেই ভুলে গেছে। কমলা বললো, ভাইজান আপনার জন্য চা নিয়ে এসেছি।
আবিদ ডাকলো কমলাকে, এসো কমলা বেলকনিতে এসো। সন্ধ্যার এই হলদেটে আলোর পৃথিবীতে চা পানের মজাটাই আলাদা।
কমলা চা নিয়ে বেলকুনিতে এলো। আবিদ তখনও রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো কমলাকে দেখে ঘুরে দাঁড়ালো।
ভাইজান আপনার চা।
আচ্ছা দাও।
আবিদ চায়ের কাপটা হাতে নিয়েই বললো, খুলিয়া দাও এই বদ্ধ ঘরের দুয়ার—-দেখিতে চাই নয়ন ভরে এই জগত সংসার। মুক্ত পাখিরা হাসে মুক্ত কলরবে- মানুষ নামের বন্দিরা কী তবে ঘরেই পড়ে রবে!
কমলা জানতে চাইলো, ভাইজান কী কবিয়া কইলেন কিছু বুঝি নাই তয় অনেক ভাল লাগছে।
আবিদ মুচকি হেসে জবাব দিলো, হ্যা কবিতা। আমি মুক্ত হতে চাই, বন্দি শিকল থেকে বেরিয়ে যেতে চাই পাখি যেমন স্বাধীনতা নিয়ে আকাশটা চষে বেড়ায়, ঠিক তেমনি পাখির মতো আমিও চষে বেড়াতে চাই, দেখতে চাই মুক্ত বিহংগনে এই জগতটাকে।
আবিদ চায়ের কাপে ঠোট লাগিয়ে এবার পরম তৃপ্তিতে নিঃশ্বাস ফেলে চুমুক দিলো। তৃপ্তি এবং সতেজতা নয়, বিস্বাদ কিছু মুখে পড়েছে বলে মনে হলো। আবিদ ভেবেছিলো এই সময়ে এক কাপ চা পানে তাঁর শরীর এবং মনকে ফুরফুরে সতেজ করে তুলবে, সেটা আর হলো না। আবিদ বললো, কমলা তুমি মনে হয় আজ চা’তে চিনি দিতে ভুলে গেছো।
আবিদের কথাটা শোনে কমলা একটু হাসলো। আবিদ বোকার মতো চেয়ে রইলো কমলার হাসিমাখা মুখের দিকে।
আবিদ বললো, তুমি হাসছ কেন?
হাসি থামিয়ে কমলা জবাব করলো, ভাইজান আপনার কথা শোনে। আপনি কইলেন না চায়ে চিনি কম হইছে! আসলে চিনি কম হয় নাই, আর আমিও ভুলে যাই নাই। এই বাড়িতে চা’র সাথে কোন চিনি কিংবা দুধ খাওয়া হয় না।
আবিদ বললো কেন? চা’য়ে চিনি, দুধ কেন খাওয়া হয়না?
সেইডা নীলা আপা জানে। নীলা আপা নিয়ম করছে চা’য়ে কোন চিনি খাওয়া যাবে না। আপার ধারণা চা পান করে চায়ের আসল স্বাদটাও পরখ করে দেখা উচিৎ। তাই এই বাড়িতে শুধুই লীগার করা চা খেতে হয়। আপনাকেও খেতে হবে নীলা আপার হুকুম, যদি খেতে না চান তাহলে বাহিরে খেতে হবে।
আবিদ একটু অবাক হলো কমলার কথা শোনে নিতান্তই নীলা ভুল কিছু করেনি, অনেক বুদ্ধিমানের একটা কাজ করেছে।

(এটা আমার নতুন একটি উপন্যাস ‘শালিক’ তার কিছু অংশ তুলে দেয়া হলো।)

লেখক: আমিনুল ইসলাম-

                                   তরুণ লেখক ও সাহিত্যিক, aminulislamsub@gmail.com

Share.

Leave A Reply

75 − 66 =