গল্পটা একজন মোরশেদা বেগমের

0

সাইমুম সাদ-

মায়ের গর্ভের হিসেবে আবিরের বয়স সাত মাস। দুনিয়ার আলো দেখার আগেই পরকালের পথ ধরার কথা ছিল। টিকিটও রেডি, অপেক্ষা শুধু সময়ের। দ্বিতীয়বারের মতো ‘অ্যাবোরশন’ করানো হবে তার মায়ের। এর আগে তার অনাগত ভাই অথবা বোনকে ছুড়ির আঘাতে খুন করা হয়েছে।

এবার তার পালা। কিন্তু আবির বুঝতে পারছে না, তার কী পাপ? আমি কি পিতৃপরিচয়হীন? নাহ তো! আমার বাবা আছেন। নাম মোখলেসুর রহমান। তাহলে? কারণটা প্রাগৈতিহাসিক। নুন আনতে পান্তা ফুরায় সংসারে আরেকটা খাদ্য গ্রহণের মুখ বাড়বে। বাড়বে সংসারের খরচ। আবার যদি আবির না হয়ে অন্তরা হয়ে জন্ম নেয়-তাহলে বিয়ে-শাদির খরচ মরার উপর খরার ঘা হয়ে উঠবে। পরিবারের কেউই এই উচ্চমার্গীয় মঙ্গার সময়ে আরেকটা খাদক মুখ বাড়ানোর ঝুঁকিটা নিতে চাইলেন না।

একে একে সবাই আবিরের মৃত্যুর পক্ষে স্বাক্ষর করে গেলেন। পারলেন না শুধু মা। মোরশেদা বেগম। নামটা অনেকেই জানেন না। শৈশবে তার পরিচয় ছিল আব্দুল মজিদের মেয়ে, তারুণ্যে এসে মোখলেসুরের বউ।

নিজের নাম-পরিচয় হারিয়ে সহায়-সম্বলহীন এই নারী বললেন, ‘আমার সন্তানকে আমি মানুষ করব। প্রয়োজনে অন্যের বাড়িতে কাজ করব। সন্তানকে পড়াশোনা করাব। মানুষের মতো মানুষ করব।’

মোরশেদা বেগমের চোখে-মুখে বারুদ। যেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। দুনিয়ার সরলদের চাপা ক্ষোভ আর ভালোবাসা মিশলেই সম্ভবত বারুদের জন্ম।

মাঝরাতে হাসপাতাল থেকে পালালেন মোরশেদা বেগম। তিনমাস বয়ে বেড়ালেন আপন সত্ত্বার ভেতরে বেড়ে ওঠা আরেক সত্ত্বাকে।

সন্তানের সঙ্গে ঐশ্বরিক যোগাযোগ তার। উনার ধারণা, পুত্র হবে তাঁর। পুত্রের সঙ্গে কথা বলেন, ‘বাপ আমার, তোরে আমি মরতে দিব না। পড়াশোনা করিয়ে তোরে মানুষ করব। এই গ্রাম ছেড়ে আমারে শহরে নিয়ে যাস তো। তুই ছাড়া আমার আর আপন কেউ নাই দুনিয়ায়।’

আবির হাত-পা নাড়ায়। মা ভাবেন, সন্তান তার কথা বুঝছে। আনন্দে তার চোখ-মুখের গোলাটে মানচিত্রে স্বর্গ নামে।

ভরা বর্ষণের এক রাতে নানাবাড়িতে প্রথম কান্নার আওয়াজ শোনা গেল আবিরের। সন্তানের কানে আজান দেওয়া হলো। আর মায়ের কানে এসে দুঃসংবাদটা দিলেন এক আত্মীয়, ‘তোকে তালাক দিয়েছে ওর বাপ।’

খারাপ খবরেও বিচলিত নন মোরশেদা বেগম। চৌদ্দ বছর বয়সে পঁচাত্তরের অস্থির সময়ে দুইটা গরু পণ বাবদ তাকে বিয়ে করেছিলেন মোখলেসুর রহমান। সেই জোড়া গরুর চেয়েও অবহেলিত ছিলেন ওই বাড়িতে। উঠতে-বসতে মারধর। যৌতুকের টাকার জন্য হুঙ্কার। নিরবে সইতে সইতে বিতৃষ্ণার পাহাড় জমেছিল বুকে।

সিদ্ধান্ত নিলেন আর বিয়ে করবেন না। নানার কাছ থেকে পাওয়া তিনকাঠা জমি চাষাবাদ শুরু করলেন। মুরগী পাললেন। বাড়ির পেছনে কুমড়োর মাচান ফেললেন। জমানো টাকায় গরু কিনলেন। সন্তানের পড়াশোনার জন্য কষ্টের পাহাড় সেঁচে অর্থ জমালেন।

আদরে-ভালোবাসায় তরতর করে বেড়ে ওঠে আবির। স্কুলে আজ ওর প্রথম দিন। কাঁধে লাল টুকটুকে ব্যাগ, ইন করা সাদা শাট, নীল হাফপ্যান্ট আর জুতা জোড়ায় রাজপুত্রের মতো লাগছে ওকে।

স্কুলের অফিস কক্ষে স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কী?
-আবির ইমতিয়াজ
মা’র নাম?
-মোরশেদা বেগম।
বাবার নাম?
-মো্রশেদা বেগম।

মায়ের চোখের কোনায় জল টলমল। মা’র ইশারায় সাক্ষাৎকার পর্ব আর বাড়ালেন না শিক্ষক। ভর্তি শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছেলেকে বললেন, বড় হয়ে কী হবি?
-তোমার মতো হব।
কেন?
-তুমি অনেক ভালো মা। বড় হলে তোমাকে কোনো কাজ করতে দেব না। আর তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেব।

২.
চব্বিশে পা দিয়েছে আবির। মায়ের মতোই হয়েছে। কারও কাঁধে বোঝা হয়ে নয়, একলা বাঁচতে শিখেছে। নিজেই নিজের দায়িত্ব নিতে শিখেছে। স্নাতক শেষ করে নতুন চাকরি পেয়েছে।

প্রথম মাসের স্যালারিটা পেয়েই আগে মা’র জন্য সাদা পেরে শাড়ি কিনেছে। ছেলে বাড়ি ফিরছে, মায়ের কাছে। কিন্তু মুখটা বড্ড মলিন, হাসি নেই। গ্রামের যত কাছে আসে বুকটা হুহু করে ওঠে। চোখ দুটো পোড়ায়। বাড়িতে যাওয়ার আগে গ্রামের মসজিদের পেছনের আঠারো বছরের পুরনো একটা কবরের সামনে দাঁড়ায় আবির।

চোখে স্রোত নামে, বুকে ভাঙন। দুনিয়ায় আবিরের একমাত্র আপনজন ঘুমিয়ে আছে এখানটায়, মা। মা’র হাত ধরে জীবনের শেষবারের মতো হেঁটেছিল সেই প্রাইমারি স্কুলে ভর্তির দিন, ছয় বছর বয়সে। স্কুল থেকে ফেরার পথে ট্রাকচাপায় আবিরের চোখের সামনে মারা যায় মা। আঠারো বছর ধরে স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে মোরশেদা বেগম। স্মৃতিকে বুকের পাশটায় জমিয়ে রেখে যেন মা’র হাত ধরে হাঁটছে সেই ছোট্ট আাবির।

(গল্পটা একজন মোরশেদা বেগমের)

লেখক: শিক্ষার্থী, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Share.

Leave A Reply

nine × one =