ক্যান্সার শনাক্তকরণে শাবিপ্রবির নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন

0

‘ননলিনিয়ার অপটিক্স’ ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র ৫০০ টাকা খরচে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ক্যান্সারের অস্তিত্বের খোঁজ মেলা সম্ভব বলে মনে করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একদল গবেষক।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকের নেতৃত্বে এ গবেষণার কাজ শেষ হয়েছে বলে জানা যায়। রক্তের নমুনা পরীক্ষা করার মাধ্যমে খুব অল্প খরচে জানা যাবে কোন ব্যক্তির শরীরে ক্যান্সার আছে কি নেই। এর জন্য সময় লাগবে ৫-১০ মিনিট এবং খরচ পড়বে ৫০০ টাকারও কম।

উক্ত গবেষণাদলে মূলত ২৫ জন সদস্য কাজ করেছেন। পাঁচজন শিক্ষক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি’র শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গড়ে ওঠে এই গবেষণা দলটি।

গবেষক দলের সদস্য ড. শরিফ মোহাম্মদ শরাফউদ্দিনের মতে, ‘রক্ত থেকে লাল অংশ বাদ দিয়ে কেবল সেরাম ডিভাইসে দিলে প্যারামিটারে মান জানা যাবে। আর সেটা থেকেই বোঝা যাবে শরীরে ক্যান্সার আছে কি নেই।’ তবে তা সম্পূর্ণ রূপে ক্যান্সার শনাক্তকরণে ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে এখনও বলা যাচ্ছেনা। কিছু পরীক্ষা ও উন্নতিসাধনের কাজ এখনও বাকি আছে এই ডিভাইসটির।

১৯৭৭ সালে মূলত ‘ননলিনিয়ার অপটিক্স’ এর ওপর ভর করেই যাত্রা শুরু করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমে শিক্ষার্থীদের থিওরিটিক্যাল কোর্স আকারে বিষয়টি পড়ানো হলেও পরে ব্যবহারিক চর্চার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে তা ক্যান্সার শনাক্তকরণে কাজে লাগানো হয়েছে বলে জানান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষক দলের প্রধান ড. ইয়াসমিন হক। প্রথমে ১০ জন সাধারণ এবং ৬০ জন ক্যান্সার রোগীর ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। ফলাফল স্বরূপ ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর রক্তের সেরামে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

ড. ইয়াসমিন হকের ভাষ্যমতে, ১৯৯৯ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে প্রথম আবেদন করা হয় এবং সেখান থেকে পাওয়া ৮ লাখ টাকা দিয়ে এই নন-লিনিয়ার অপটিকসের মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্তকরণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। ২০১১ সালে হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (হেকেপ)-এর সহায়তায় ৩ কোটি টাকার একটি ব্যাসিক প্রজেক্টের কাজ শুরু করা হয়। আর গবেষণার জন্য একটি নন-লিনিয়ার বায়ো-অপটিকস রিসার্চ ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সংগ্রহ করে গবেষণার কাজ শুরু হয়।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে ‘নন-লিনিয়ার অপটিক্স ব্যবহার করে বায়োমার্কার নির্ণয়’ শীর্ষক প্রকল্পটি হেকেপের আওতায় গৃহীত হয়। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে নন-লিনিয়ার বায়োঅপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা হয়। এই ল্যাবরেটরিতে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের রক্তের সিরামে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে নন-লিনিয়ার সূচক পরিমাপ করার কাজ শুরু হয়েছে।

বেশিরভাগ রোগীর ক্যান্সার ধরা পরে রোগের শেষ পর্যায়। জটিল সব পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে ফলাফল পেতে পেতে রোগী মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। প্রচলিত প্রযুক্তিতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় এবং ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগে ক্যান্সার শনাক্ত করতে। তাই সেই পদ্ধতিকে সহজ করার লক্ষ্যে এই গবেষকদল কাজ করেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু উদ্ভাবিত প্রযুক্তিতে মাত্র ৫০০ টাকায় অল্প সময়েই ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব।

জানা গেছে, এরই মধ্যে এ গবেষণার ফলের পেটেন্টের জন্য একযোগে ৯ জুলাই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করা হয়েছে। এই মরনব্যধি ক্যান্সার প্রতিবছর বিশ্বে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ কেড়ে নেয়। ক্যান্সারের চিকিৎসা এতই ব্যয়বহুল যে এর চিকিৎসায় অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

তবে, প্রাথমিক অবস্থায় ঘাতক এ রোগের বিষয়টি ধরা পড়লে সিংহভাগ ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়। চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস পায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত পদ্ধতিটি চূড়ান্ত মূল্যায়নে গ্রহণযোগ্য হলে তা চিকিৎসাবিজ্ঞান তথা মানবকল্যাণে একটি বড় অবদান বলে বিবেচিত হবে।

Share.

Leave A Reply

seventy ÷ seven =