কীভাবে বুঝবেন আপনার শিশু অটিস্টিক

0

নাহিদা পারভীন

অটিজম (ইংরেজি Autism অটিজ়্ম্) শিশুর একটি নিউরোডেভেলপমেণ্টাল ডিজঅর্ডার বা বিকাশজনিত একটি সমস্যা। অটিজম একটি নিউরোডেভেলপ মেণ্টাল ডিজঅর্ডার, যা বয়স তিন বছর হবার পূর্বেই প্রকাশ পায়। অটিজম শিশুরা সামাজিক আচরণে দূর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। মানসিক সীমাবদ্ধতা ও একই কাজ বারবার করার প্রবণতা থেকে তাদের শনাক্ত করা যায়।

এক-দুই বছর বয়সে শিশুর আচরণে এ রোগের লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। অভিভাবকরাই সাধারণত প্রথমে এ রোগের লক্ষণ বুঝতে শুরু করেন। লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি।

অটিজমের প্রকাশ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন হারে ঘটে। আধুনিক গবেষণায় দেখা যায় , প্রতি হাজারে ১-২ জন অটিজমে এবং এক হাজারে ৬ জন এএসডি বা শিশুর জন্মগত হৃদরোগ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে ১৯৮০ সালের পর থেকে আক্রান্ত হয়েছে, জানা গেছে এমন রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে।

অটিস্টিক শিশুরা আকাঙ্ক্ষিত আচরণ করতে অক্ষম হতে পারে। নির্দিষ্ট বয়সে স্বাভাবিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটলেও পরবর্তীকালে তা হারিয়ে যেতে পারে। আবার নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতেও সাধারণ ব্যবহারগুলোর দেখা যেতে পারে। এই ডেভেলপমেণ্টাল বিলম্বতার মাত্রা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সকল চিকিৎসকেরা একই সিদ্ধান্তে নাও আসতে পারেন।

অটিজমের ইতিহাস –

১৯৪০ সালের দিকে ডঃ হ্যান্স অ্যাসপারগার প্রথম আত্মসংবৃতি সম্পর্কিত একটি রোগের কথা প্রথম উল্লেখ করেন যা অ্যাসপারগারের লক্ষণ নামে পরিচিত। Autism শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন সুইস মনঃচিকিৎসক অয়গেন ব্লয়লার (Eugen Bleuler)। তিনি American Journal of Insanity-তে প্রকাশিত তার একটি নিবন্ধে অস্বাভাবিকরকম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। এটি গ্রিক শব্দ{ αυτος} (আউতোস্ অর্থাৎ “আত্ম বা নিজ”) থেকে এসেছে। ব্লয়লার এ ধরণের রোগীদের ক্ষেত্রে যারা অন্য লোকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে না তাদের বোঝাতে এই শব্দের প্রচলন করেন।
বর্তমান পরিভাষায় ভগ্নমনস্কতা বা সিজোফ্রেনিয়া সম্পূর্ণ আলাদা রোগ। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এদের পৃথক করা কঠিন হতে পারে। তবে অটিজমের চিকিৎসা শাস্ত্রগত শ্রেণিবিন্যাস ১৯৪৩ সালের আগে হয় নি। ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোরে অবস্থিত জন হপকিন্স হাসাপাতালের মনঃচিকিৎসক ডঃ লিও ক্যানার সর্বপ্রথম ১১ টি মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত শিশুর আক্রমণাত্মক ব্যবহারের সামঞ্জস্যতা লক্ষ করে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন করেন এবং এ ধরনের ব্যাধির নাম দেন “early infantile autism”।

শিশুরা অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি বা যোগাযোগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, এমন রোগটিকে তিনি অটিজ্ম নামে চিহ্নিত করেন। এ বিষয়ে তার প্রথম প্রবন্ধ [The Nervous Child] নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর বর্ণনার অনেক কিছুই এখনো আত্মসংবৃত শিশুদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োগ করা হয়।

প্রায় একই সময়ে অস্ট্রীয় বিজ্ঞানী ডঃ হ্যান্স অ্যাসপারগার একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করেন। তবে তার পর্যবেক্ষণটি বেশ উঁচুমাত্রার এবং একটু অন্য ধরনের বৈশিষ্ট্যাবলীর জন্য প্রয়োগ করা হয়। এই বিষয়টির নাম অ্যাসপারগারের লক্ষণ বা Asperger’s syndrome। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তার প্রবন্ধগুলো ইংরেজিতে অনূদিত না হওয়ার কারণে তার পর্যবেক্ষণগুলো অনেকদিন কোন স্বীকৃতি পায় নি। ১৯৯৭ সালে তার প্রবন্ধগুলো স্বীকৃতি পায় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। রবার্ট এল বার্কার উল্লেখ করেছেন, অটিজম এমন একটি বিকাশ জনিত সমস্যা, এতে ব্যক্তির মধ্যে বাইরের জগত সম্পর্কে সামান্য আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।

অটিস্টিক শিশুর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যঃ

যোগাযোগ ও আচরণের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে অটিস্টিক শিশুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এছাড়া কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হলো-

১. নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না।
২. কোন খেলনা বা আনন্দদায়ক বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয় না।
৩. কারো আদরও পেতে চায় না।
৪. বিশেষ আচরণ বার বার করতে চায়।
৫. নিয়ম মাফিক কোন কিছু করে না।

অটিজমের কারণ:

অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখন পর্যন্ত নির্ণয় করা যায় নি। তবে বিজ্ঞানীদের মতে অটিজমের পিছনে দুটি কারণ রয়েছে-
১. জিনগত সমস্যা।
২. পরিবেশগত সমস্যা।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর ডিএনএ জিনে কপি নাম্বার অফ ভ্যারিয়্যান্ট (সিএনভি)নামক সমস্যা বহন করে। পরিবেশের বিষাক্ত উপকরণ স্নায়ুকোষ ধ্বংস করে। বিষাক্ত উপকরণগুলো গর্ভের শিশু এবং শিশুর বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ের মস্তিস্কের স্নায়ু কোষকে ধ্বংস করে। যেসব রাসায়নিক দ্রব্য অটিজমের জন্য দায়ী। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মার্কারি ও লেড।

আবার অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এটি একটি নিউরোলজিক্যাল বা মস্তিস্কের সমস্যা। কারণ কিছু ক্ষেত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মস্তিস্কের কিছু অসুবিধা লক্ষ্য করা যায়। যেমন-
১. মস্তিস্কের কোনোরূপ গঠনগত সমস্যা।
২. মস্তিস্কের অস্বাভাবিক ক্রিয়া।
৩. নিউরোকেমিকেলের অসামঞ্জস্যতা।
৪. হরমোনের অসামঞ্জস্যতা।

অটিজম এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট-

বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। সমাজ সেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী সনাক্তকরণ জরিপে বাংলাদেশে প্রতি ৫০০ শিশুর মধ্যে একটি অটিজমের শিকার। সে হিসাবে মোটামুটিভাবে অটিজমে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২ লাখ ৮০ হাজারের কম হবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চালিত একটি জরিপে বলা হয়েছে,ঢাকা শহরে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা গ্রাম অঞ্চলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে-বাংলাদেশে প্রায় ১শতাংশ শিশু বা ব্যক্তি অটিজমের বৈশিষ্ট্য বহন করছে।

অটিজম শিশু চিকিৎসার উপায়:
গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করা গেলে অটিজম নিয়ে জন্ম নেয়া শিশু প্রাপ্তবয়সে অনেকটাই স্বাভাবিক হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে বলতে বুঝায়, জন্মের ১৮ মাস থেকে ৩৬ মাস বয়সের মধ্যে অটিজম শনাক্তকরণ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিক্ষা পরিকল্পনার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিশুকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া। অটিস্টিক শিশুর প্রধান চিকিৎসা নিওরোবিহেভিওরাল থেরাপি, অতিরিক্ত আচরণগত সমস্যা ও শারীরিক সমস্যার জন্যে মেডিকেল চিকিৎসা এবং বিশেষ স্কুলে শিক্ষা দেওয়া। দেখা গেছে স্বল্প ও মধ্যম মাত্রার অটিজম প্রাথমিক অবস্থায় ধরা গেলে এবং সঠিকভাবে পরিচর্যা ও শিক্ষা পেলে রোগের উপসর্গ অনেকাংশ কমানো যেতে পারে।

Share.

Leave A Reply

× one = 3