‘কিল্লা আওরঙ্গ’থেকে লালবাগ কেল্লা

0

সুমাইয়া জামান-

সাল ১৬৭৮, পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকা। মোল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র আজম শাহ বাংলার সুবেদার হয়ে ঢাকায় আসেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন একজন মানুষ।

আজম শাহ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে একটি  দূর্গ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং তা নির্মাণের  কাজও শুরু করে দেন। তার পিতা আওরঙ্গজেবের সম্মানে দূর্গটির নাম রাখেন ‘ কিল্লা আওরঙ্গ’। দূর্গ মূলত তৎকালীন আমলে রাজবংশের আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হত । কিন্তু আজম শাহের ছিল বিভিন্ন স্থাপত্য নির্মাণের শখ। তাই আত্মরক্ষার দূর্গটি হয়ে ওঠে শখের মহল।

তবে শখের এই  মহলটি শখের বশে তৈরীর কাজে হাত দিলেও এর কাজ সমাপ্ত করতে পারেন নি আজম শাহ।   ১৬৭৯ সালে  মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আক্রান্ত হন মারাঠাদের দ্বারা। তাই নিজের শক্তি বাড়াতে তিনি ডেকে পাঠান আজম শাহকে। ফলে  কিল্লা আওরঙ্গের কাজ স্থগিত হয়ে যায় মাঝপথেই।

১৬৮০ সাল, দ্বিতীয়বার বাংলার সুবেদার হয়ে ঢাকায় আসেন শায়েস্তা খান। তিনি সুবেদার হয়ে আসার পর আওরঙ্গজেব  কিল্লা আওরঙ্গের দায়িত্ব দেন শায়েস্তা খানকে এবং সেই সাথে কেল্লার কাজ সমাপ্তির জন্য অনুরোধ করেন।

শায়েস্তা খান  সম্রাট আওরঙ্গজেবের এই অনুরোধ রাখেন। তিনি কেল্লার কাজ প্রায় সমাপ্ত করে ফেলেন এবং সেই সাথে ‘কিল্লা আওরঙ্গ’ নাম পরিবর্তন করে একটি নতুন নাম দেন। আর সেই থেকেই  ‘কিল্লা আওরঙ্গ ‘ ‘লালবাগ কেল্লা’ নামে পরিচিত হল আমাদের সবার কাছে।

Image result for লালবাগ কেল্লা

অনেকের মতে লালবাগ কেল্লা কিছুটা অবজ্ঞার শিকার হয় শায়েস্তা খানের কাছে। তবে তাঁর ছিল একটি যুক্তি সংগত দিকও।শায়েস্তা খানের ছিল একটি অত্যন্ত আদরের মেয়ে। নাম ইরানি দূখত। আদর করে তাঁকে পরীবিবি ও ডাকা হত। কেল্লা নির্মানের কাজে হাত দেওয়ার কিছু দিন পরেই পরীবিবির দুঃখজনক ভাবে মৃত্যু হয়।  ফলে শায়েস্তা খান হয়ে পড়েন অত্যন্ত শোকাহত।

মৃত্যুর কিছু দিন পরেই পরীবিবির বিয়ে হওয়ার কথা ছিল মোল সম্রাট আওরঙ্গজেবের  পুত্র আজম শাহের সাথে। তাই শায়েস্তা খান কেল্লাকেই অপয়া মনে করেন এবং প্রায় সমাপ্তি সময়ে নির্মাণ কাজ স্থগিত করে দেন। তবে কন্যার প্রতি তীব্র ভালোবাসার দিক থেকে শায়েস্তা খান কন্যার সমাধিকে ঘিরেই গড়ে তোলেন একটি সমাধি সৌধ। 

পরীবিবির মাজারটি গোলাপী রঙের ও কালো রঙের পাথর দিয়ে সজ্জিত অনুচ্চ একটি প্লাটফর্মের উপর নির্মাণ করা হয়। সমাধি সৌধের চারদিকে চারটি উচু মিনার, যার প্রতিটির মাথায় চারটি ছোট গম্বুজ রয়েছে। সৌধের চারদিকে চারটি খাজকাটা দরজাও বানানো হয়। পরীবিবির মাজারের দক্ষিন-পূর্ব কোণে আরও একটি ছোট কবর রয়েছে ,যেটি শায়েস্তা খানের পালিত কন্যার কবর।

পরীবিবির সমাধি সৌধটি শায়েস্তা খান অনের পরিকল্পিতভাবে তৈরী করেন। সৌধের ভেতরেই রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট নয়টি কক্ষ। তবে মাঝের কক্ষটি সবথেকে বড় এবং এর মাঝামাঝিই দাফন করা হয় পরীবিবিকে। সৌধের বাইরের সৌন্দর্য যেমন আকর্ষনীয়, তেমনি ভেতরের সৌন্দর্য রক্ষায়ও শায়েস্তা খান কোন কার্পন্য করেন নি। সৌধের ভেতরের দিকটি মার্বেল পাথর, কালো পাথর ও বেলে পাথর দিয়ে অত্যন্ত সুক্ষভাবে সাজানো হয়েছে। এর ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থাও রয়েছে।

লালবাগ কেল্লার মূল ভবনটি মূলত তিন তলা। ভবনের নিচ তলার মাঝবরাবর একটি প্রবেশ পথ রয়েছে এবং এই পথটিই বর্তমানে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও প্রস্থানের  জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। মূল্যবান পাথর দ্বারা এই প্রবেশ পথ সাজানো হয়েছে।

মূল ভবনের পাশে আরও একটি ভবন রয়েছে, যেটি একটি দ্বিতল ভবন। জানা যায়, এই ভবনের উপরেই দরবার হল বা বিচার গৃহ ছিল। এই ভবনের নিচে হাম্মাম খানা বা গোছল খানা  রয়েছে। এখানে সেই সময়ে বিশেষ করে মহিলারা গোছল করতেন। এই হাম্মাম খানায় বিভিন্ন উত্তাপের গরম বা ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা ছিল। ছিল বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি সুগন্ধির ব্যবস্থাও। সম্প্রতি এই ভবনের উপর একটি ফুলের বাগানের নকশা আবিষ্কৃত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি শায়েস্তা খানের আমলে তৈরীকৃত বাগান।

দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে বিশাল একটি পুকুর, যার ধারগুলো লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরা। যদিও এই পুকুরটি গোসল বা অন্যান্য কাজের জন্য খনন করা হয়েছিল, তবে এই পুকুরটি এই ধরণের কোনো কাজে ব্যবহার হয় নি বলেই জানা যায় । পুকুর পাড়ের পাশে দাড়ালেই সামনে চোখে পড়বে একটি বিরাট মাটির ঢীবি যার উচ্চতা প্রায় এক তলা ভবনের সমান। এই ঢীবির পাশেই আবিষ্কৃত হয়েছে একটি অন্ধকার কুঠুরি । এই কুঠুরি কে ঘিরে অনেক রহস্যের সৃষ্টি  হয়েছে।

বলা হয়, এই কুঠুরির ভেতর যে এক বার প্রবেশ করে সে আর ফিরতে পারে না। কুঠুরির ভেতর  কোন আলোর  সূক্ষ রেখাও চোখে পড়ার কোনো উপায় নেই। তার চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে রয়েছে।

Image result for লালবাগ কেল্লা

জনশ্রুতি আছে , এক কুকুরের গলায় দড়ি বেধে এই কুঠুরির ভেতর পাঠানো হয়। কিছু সময় পর, কুকুরের গলার দড়ি ফিরে  আসলেও ফেরে নি সেই কুকুর। আবার অনেকে বলেন, এক বিদেশি সাংবাদিক এই রহস্য ভেদের উৎসাহে ক্যমেরা নিয়ে এই অন্ধকার রহস্য ও ভীতিময় জগতের ভেতর যান, তবে এই অভিশপ্ত কুঠুরি ফিরতে দেয় নি সেই সাংবাদিক কেও। তবে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বর্তমানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কুঠুরির মুখ।

তবে লালবাগ কেল্লা বহুবার শিকার হয়েছে অবহেলা ও অযত্নের। শায়েস্তা খানের ঢাকা ত্যাগের পর রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্ব হারাতে থাকে ঢাকা। পরে রাজধানী ঢাকা থেকে স্থানান্তরিত করে নিয়ে যাওয়া হয় মুর্শিদাবাদে। ফলে আরও একবার মানুষের যত্নশীল দৃষ্টির আড়াল হয়ে যায় কেল্লাটি।

পরে ১৮৫৩ সালে ঢাকা পুরানো পল্টনে সেনানিবাস স্থানান্তরিত করা হলে লালবাগ কেল্লাকে ব্যবহার করা হয়। তবে তার যথার্থ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়  নি মোটেই। এই সেনানিবাস ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ছিল। ১৮৫৭ ও ১৯৪৮ সালে ঢাকার লালবাগ এলাকায় ঘটে যায় এক করুন রক্তাপ্লুত ঘটনা যা লালবাঘ বাসী এখনো ভয়ার্ত মনে স্বরণ করেন। ১৮৯৭ সালে ঢাকা শিকার হয় এক ভয়াবহ ভূমি-কম্পনের। এই ভূমি কম্পনেও পরীবিবির মাজার বিস্ময়করভাবে টিকে ছিল।

সুদীর্ঘ বছর পর লালবাঘ কেল্লা মানুষের যত্নদৃষ্টিতে পড়ে। কেল্লাকে তখন যথার্থ সংস্করণ করে জনসাধারনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ফলে মানুষের পদাচারন আরও  বাড়ে  এবং শায়েস্তা খানের ও আজম শাহের স্মৃতি ঘেরা লালবাঘ কেল্লা আবার জীবিত হয়ে ওঠে।

বর্তমানে লালবাগ কেল্লা একটি বেশ জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কেল্লাকে কেন্দ্র করে তার আশেপাশে গড়ে উঠেছে অনেক রেস্টুরেন্ট ও হোটেল।   প্রতিদিন দেশ- বিদেশ থেকে বহু মানুষ শায়েস্তা খানের এই অসাধারন নির্মাণকে দেখতে আসে এবং হারিয়ে যায় আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগের দুনিয়ায়।   

লালবাগ কেল্লা সোমবারে খোলা থাকে দুপুর ১:৩০ থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত। মঙ্গলবার থেকে শনিবার খোলা থাকে সকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত। শুক্রবার জুমার জন্য দুপুর ১২ টা থেকে ২ টা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। প্রবেশ মূল্য মাত্র ১০ টাকা।

লেখক, শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Share.

Leave A Reply

three + = 5