ঐতিহাসিক ট্রয়

0

আমিনুল ইসলাম নাবিল- 

ট্রয় নামটির সাথেই এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। যা বাস্তব ও রূপকথা উভয়েরই অদ্ভুত মিশ্রনে তৈরি। রূপকথার প্রসঙ্গ উঠলেই চলে আসে হোমারের কাব্যগ্রন্থ ইলিয়াডের কথা। মহাকবি হোমারের বিখ্যাত মহাকাব্য ইলিয়াডে ট্রয় নগরী বলতে বোঝানো হয়েছে দুর্ভেদ্য দেয়াল ঘেরা এমন এক নগরীর কথা, যা দীর্ঘ দশ বছর অবরুদ্ধ করে রাখে ৫০ হাজার গ্রিক সৈন্য।

রূপকথার রাজ্যে দেখা মেলে প্রাচীন ও শক্তিশালী এ নগরীর পতন, রাজা অ্যাগামেননের নেতৃত্বে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ও গ্রিক সৈন্যদের বিজয়ের গল্প। ইলিয়াডে এই যুদ্ধকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ট্রোজান যুদ্ধ নামে। ট্রয়ের অধিবাসীদের বলা হত ট্রোজান জাতি। এখান থেকেই ট্রোজান যুদ্ধের নামকরণ করা হয়েছে।

ইলিয়াডের কাহিনী মতে, স্পার্টার রানী হেলেনকে ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস অপহরণের কারণে ট্রোজান যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে মানুষের পাশাপাশি পৌরাণিক দেব-দেবীদের অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

ট্রয় বলতে বাস্তবের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের কথাও নির্দেশ করা হয়, যার অবস্থান বর্তমান তুরস্কের উত্তর উপকূলে। এই স্থানের আধুনিক নাম হিসারলিক। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটাই রূপকথার সেই ট্রয় নগরীর ধ্বংসাবশেষ। তবে, আসলেই ট্রোজান যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিলো কিনা, তা তর্কের বিষয় হিসেবেই থেকে যায় অনাদিকাল।

ট্রোজান যুদ্ধ চলাকালে ট্রয়ের শাসনকর্তা ছিলেন রাজা প্রিয়াম। এদিকে ট্রোজান যুদ্ধের বক্তা হোমারের জন্ম আরও চারশ বছর পর। ইলিয়াডের আগে ট্রোজান যুদ্ধ সম্পর্কিত কোন দলিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে শুধু ট্রোজান যুদ্ধই ট্রয় নগরী পতনের একমাত্র কারণ না। অতীতে ট্রয় নগরী একাধিকবার ধ্বংস হয়েছিলো এবং পুনরায় গঠিত হয়েছিলো। প্রত্নতত্ত্ববিদরা ট্রয়ের ৯টি ভিন্ন ভিন্ন স্তর খুঁজে পেয়েছেন, যা ট্রয় নগরীর সুদীর্ঘ উজ্জ্বল ইতিহাস এবং একাধিকবার এটি ধ্বংস ও পুনর্গঠনের প্রমাণ বহন করে।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের হিসাব মতে, ট্রয় নগরী টিকে ছিল প্রায় ৪ হাজার বছর। খ্রিস্টপূর্ব ১৩শ সালে ট্রয় নগরী একবার ধ্বংস হয়েছিলো ভূমিকম্পের কারণে। এরপর শহরটি আরও ১শ বছর স্থায়ী হয় এবং আবারও সমৃদ্ধ রূপ ধারণ করে। ১১৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এটি আবার ধ্বংস হয়, এবারের কারণ ট্রোজান যুদ্ধ। এই যুদ্ধের পর ট্রয় নগরী আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

সুতরাং বেশিরভাগ প্রত্নতত্ত্ববিদ এ বিষয়ে একমত যে, ট্রোজান যুদ্ধ ট্রয় ধ্বংসের একমাত্র কারণ না হলেও, মূলত এই যুদ্ধের ফলেই সমৃদ্ধ এ শহরটি হারিয়ে যায় ইতিহাসের গহ্বরে।

ইলিয়াডের একদম শেষ প্রান্তে এরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ আছে, যাতে গ্রিক বীর একিলিসের সঙ্গে ট্রোজান যোদ্ধা হেক্টরের লড়াই সংঘটিত হয়। হেক্টর জানতো, একিলিসের সঙ্গে লড়াইয়ে জেতা তার পক্ষে সম্ভব না। তাই লড়াইয়ের একপর্যায়ে সে পালাতে শুরু করে। পেছন পেছন তাকে ধাওয়া করে একিলিস। হেক্টর দৌড়ে যখন ট্রয়ের দরজার কাছাকাছি তখন দেবতারা তাকে বাধা দেয়। ফলে একিলিসের হাতে মারা পড়ে হেক্টর।

শিল্পীর তুলিতে একিলিসের হাতে হেক্টরের মৃত্যুহোমারের আরেকটি সৃষ্টি ওডিসিতে ওঠে এসেছে ট্রোজান যুদ্ধের পরবর্তী সময়ের কথা, যেখানে গ্রিক বীর ওডিসিয়াস যুদ্ধ শেষে নিজের বাসভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায়। সেখানে ‘ট্রোজান হর্স’ সম্পর্কে বিষদ বর্ণনা করা হয়। এই ট্রোজান হর্সই ছিল ট্রয় যুদ্ধে ট্রোজানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইলিয়াড ও ওডিসিতে ইতিহাসের সঙ্গে কাল্পনিক বিষয়বস্তুর সংমিশ্রণ ঘটায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে বেশিরভাগ মানুষই এই বিশ্বাস থেকে সরে এসেছিলেন যে, ট্রয় নগরী বলতে আসলেই কিছু ছিলো। তবে তুরস্কের হিসারলিকে এই নগরীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের পর মানুষ আবার নতুন করে ট্রয় ও ট্রোজান যুদ্ধের কথা বিশ্বাস করতে শুরু করে।

Share.

Leave A Reply

fifty nine + = sixty two