একদিনে চায়ের দেশে ভ্রমণ

0

এই লেখাটা শুধু তাদের জন্যে, যারা মূলত চাকরি বা পড়াশুনার কারণে সপ্তাহে একদিনের বেশি ছুটি পান না। এবং যারা কম বাজেটে বেশি ঘুরতে চান। আমি এখানে শুধু ট্যুরপ্লান টা দিবো। জায়গাগুলির বর্ণনা জানতে চাইলে একটু কষ্ট করে গুগলে সার্চ করবেন।

এই ১ দিনের ট্যুরপ্লানে আপনি যেই জায়গাগুলি দেখতে পারবেন,

১= লাউয়াছড়া উদ্যান।
২= মাধবপুর লেক।
৩= চা বাগান, আনারস বাগান।
৪= বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সমাধি।
৫= খাসিয়া পল্লী
৬= সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা।
৭= বধ্যভূমি ৭১।
৮= বি টি আর আই।
৯= নীলকণ্ঠ টি কেবিন।

প্রথমে বলে রাখি, এই ট্যুর প্লান ফলো করতে হলে আপনাকে চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করতে হবে সারাদিনের জন্যে। অনেকে সিএনজি নিয়ে ঘুরলেও চান্দের গাড়ি আপনাকে যতটা দূর্গম রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাবে, সিএনজি সেখান দিয়ে যেতে পারবে না।

ট্রেনে বা বাসে যেভাবেই যান, ভোরের মধ্যেই শ্রীমঙ্গল পৌছে যাবেন।

ছবি- আসিফ ইউসুফ

আগে থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে যাবেন নাহলে প্রচুর সময় নষ্ট হবে।

৬ টার মধ্যেই রিজার্ভ করা গাড়িতে করে চলে যাবেন পানসী/পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট এ (সেখানে ভালো টয়লেটের ব্যাবস্থা আছে)। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিবেন।

তারপরে চলে যাবেন প্রথম গন্তব্য লাউয়াছড়ার উদ্দেশ্যে। এদিক সেদিক না তাকিয়ে সোজা ভিতরে চলে যাবেন। ১-১.৫ ঘন্টা বনের মধ্যে ঘুরে বেড়িয়ে আসবেন।

এরপরের গন্তব্য মাধবপুর লেক। মাধবপুর লেকের বা পার্শে উঁচু উঁচু টিলা আছে। সোজা টিলার উপরে চলে যাবেন। টিলার উপর বসে লেকের অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে। কিছুক্ষণ থেকে নেমে আসুন।

এবার যেতে হবে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদূর রহমানের সমাধিসৌধে। এটা একেবারে বর্ডারের কাছে হওয়ায় এখানে বিজিবি ক্যাম্পও আছে। যাওয়ার পথে চা বাগানের সৌন্দর্যে আপনি মুগ্ধ না হলে টাকা ফেরত।

ফিরতি পথে আনারস বাগান হয়ে আসবেন। আনারস লাগানো হয় টিলার উপরে। তাই এই আনারসের গাছের ভিতর দিয়ে উপরে ওঠার সময় সাবধানতা অবলম্বন করবেন। কেননা আনারসের পাতায় যেকোন সময় আপনার হাত-পা কেটে যেতে পারে। চাইলে টিলার নিচ থেকেও দেখে ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে উপরে উঠতে হবে।

সেখান থেকে চলে যাবেন খাসিয়া পল্লি। খাসিয়াদের সাজানো গোছানো ঘরবাড়ি দেখতে খারাপ লাগবে না। এতক্ষণে দুপুর পাড় হয়ে গেছে। ক্ষুধায় পেটের অবস্তা খুবই খারাপ। তাই এদিকওদিক না তাকিয়ে সোজা দৌড় দিন পানসী/পাঁচভাইয়ের দিকে।

দুপুরে একটা জম্পেশ খাবার খেয়ে চলে যাবেন সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানার উদ্দেশ্যে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা এই চিড়িয়াখানা দেখলে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না। ছোট এই চিড়িয়াখানায় এমন কিছু প্রাণী আছে, যা আমাদের ঢাকার মিরপুর চিড়িয়াখানাতেও নেই।

এখান থেকে বের হয়ে চলে যাবেন বধ্যভূমি ৭১। জায়গাটা সুন্দর কিন্তু বেশি সময় কাটানোর মতো না। তাই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পরবেন।

এবার যেতে হবে বি টি আর আই (বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউট)। ভেতরে ঢুকতে হলে গেটে কিছু বকশিশ দিতে হবে। ভিতরে ঢুকে ঘাসের কার্পেটে একবার না বসলে আপনার এখানে আসাই বৃথা। একেবারে পিছনে থাকে থাকে সাজানো চা বাগানও দেখে আসতে পারেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে পারেন।

সন্ধ্যায় বের হয়ে চলে যাবেন নীলকণ্ঠ টি কেবনের উদ্দেশ্যে। শ্রীমঙ্গলের আসল ৭/৮/৯ লেয়ারে চা এখানেই পাওয়া যায়। চায়ের স্বাদ নিয়ে নানাজনের নানা মত আছে। কিন্তু আমার কাছে খারাপ লাগেনি। আর আমার কথা স্বাদ যতই খারাপ হোক, লাইফে একবার হলেও এর স্বাদ নেওয়া উচিৎ।

তারপরে সেখান থেকে বের হয়ে পানসি/পাঁচভাইয়ে রাতের খাবার খেতে খেতে আড্ডা দিয়ে অনাসেই ১ ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়।

এবার ফেরার পালা। এখান থেকে বেড়িয়ে সোজা চলে যান ট্রেনস্টেশন/বাস কাউন্টারে। এবার বাকিটা সময় নিজেরা গল্প/আড্ডাবাজী করে পার করে দিতে পারেন।

খরচের হিসাব।
১= যাওয়াআসার ভাড়া নিজের কাছে। ট্রেনের টিকিট ২০০ থেকে শুরু করে ৮০০ পর্যন্ত আছে। আবার বাসে ২৫০ থেকে ৪০০ তেও যেতে পারবেন।
২= খাবার খরচও নিজের কাছে। কেউ ঘুরতে গিয়ে রুটি কলা খায়, কেউ ডাল ভাত খায় আবার কেউ বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে যায়।
৩= লাউয়াছড়ায় প্রবেশ টিকিট ৫০ টাকা। (স্টুডেন্ট আইডি কার্ড সাথে থাকলে ২০/২৫ টাকা) গাড়ি পার্কিং ৫০ টাকা।
৪= মাধবপুর লেকে প্রবেশ ফ্রি। কিন্তু গাড়ি পার্কিংয়ের জন্যে ৫০ টাকা দেওয়া লাগবে।
৫= সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায় প্রবেশের জন্যে সম্ভবত ২০ টাকা প্রবেশ ফি এবং ২০ টাকা পার্কিং।
৬= বি টি আর আই তে প্রবেশের জন্যে জনপ্রতি ৫০ করে চাইতে পারে। আপনি কনভেন্স করতে পারলে জনপ্রতি ২০ করেও কাজ হয়ে যাবে।
৭= নীলকণ্ঠ টি কেবিনে চা খেতে চাইলে সেটার খরচও নিজের কাছে। ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা পর্যন্ত এক কাপ চা পাবেন। যেমন চা তেমন দাম।
৮= চান্দের গাড়ির ভাড়া নিবে ৩০০০ টাকা। ১০-১২ জন বসতে পারবেন। গাড়ি ভোর ৫.৩০/৬ টার দিকে আপনাদের তুলে নিবে। সারাদিন ঘুরিয়ে সন্ধ্যা ৭ টার দিকে নামিয়ে দিবে।

আমাদের জনপ্রতি খরচ হয়েছিলো ১৩০০ করে। আমরা কিছু বাড়তি খরচ করেছিলাম যা এখানে দেওয়া নেই।

কিছু কথা-
১= লাউয়াছড়ার ভিতরে মোবাইলের নেটওয়ার্ক থাকেনা। তাই একা একা কোনদিকে চলে যাবেন না। গ্রুপের সাথে থাকবেন।
২= লাউয়াছড়া মূলত একটা সংরক্ষিত বন। বন্য প্রাণীদের অভয়ারণ্য। তাই বনের ভিতরে চিল্লাচিল্লি করবেন না।
৩= সকালে লাউয়াছড়ায় গিয়ে টিকিট কাউন্টারের লোক না পেলে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করবেন না। টিকিট ছাড়াই ভিতরে চলে যাবেন। বের হওয়ার সময় তারা আপনার কাছ থেকে টিকিটের টাকা নিয়ে নিবে।
৪= দুপুরের খাবার খেতে দেরি হবে। শুকনা কিছু খাবার সাথে রাখবেন।
৫= ড্রাইভার সাহেবকে খাওয়াতে ভুলবেন না। যেই মানুষটা সারাদিন আপনাদের নিয়ে ঘুরবেন, তাকে খাওয়ানোটা অনেকটা নৈতিক দায়িত্ব।
৬= বাসে না গিয়ে ট্রেনে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। তাতে রাস্তায় জ্যামে পরার ভয় কিংবা সময়মত পৌছানোর টেনশন থাকবেনা।
৭= উপবন এক্সপ্রেসে করে গেলে রাত ৪ টার দিকে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে নামিয়ে দিবে। ভোর হওয়া পর্যন্ত স্টেশনেই গল্প করে কাটিয়ে দিতে পারেন। বা স্টেশনের বাইরের হোটেল/দোকানগুলি সারারাত খোলা থাকে। সেখানে গিয়েও হালকা চা নাস্তা খেতে খেতে আড্ডা দিতে পারেন। পুরোটাই সেফ জোন।
৮= অবশ্যই গাড়ি আগে থেকে ঠিক করে যাবেন। নাহলে সেখানে গিয়ে গাড়ি ঠিক করতে করতে প্রচুর সময় নষ্ট হবে।

আপনাদের সুবিদার্থে আমাদের চান্দের গাড়ির ড্রাইভারের নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। অসম্ভব ভালো একটা মানুষ। তাকে জায়গাগুলির নাম বললেই হবে। সে নিজের মতো করে ঘুরে দেখাবে। 01710601605 (মামার নামটা ভুলে গেছি, তাই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি)।

বিঃ দ্রঃ একদিনের ট্যুরে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হয় টাইম ম্যানেজমেন্ট এর দিকে। নাহলে একটার পর একটা জায়গা স্কিপ করে যেতে হবে।

হ্যাপি ট্রাভেলিং।

লেখক- জোবায়ের আহমেদ

Share.

Leave A Reply

55 − 45 =