একজন প্রহরীর গল্প

0

হাকিম মাহি- 

ক্লাস ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচ বছর একটি লাইব্রেরির রাত্রিকালীন পাহারাদার ছিলাম। সেই সুবাদে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, শরৎচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, সক্রেটিস, প্লেটো, ভলতেয়ার, মার্কস, লেনিন, লালন আরও অনেক লেখক, সাহিত্যিক, কবি, দার্শনিকদের পড়ার সুযোগ হয়েছে| চিন্তা করতাম সারারাত তো জেগেই থাকতে হবে, তাহলে বই পড়েই সময়টা না হয় পার করি। কথাগুলো বলছিলেন, টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার থানার পাথরাইল গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে উদয় হাকিম।

উদয় হাকিম স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সুনামের সাথে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি নেন। নিজ গ্রামের পাথরাইল স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উদয় হাকিম মেধা ও মননে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ক্লাসের মাস্টার মশাই যেখানে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের থেকে কোন পড়া জিজ্ঞাসা করে পেতেন না, সেখানে উদয়ের কাছে থেকে সব তথ্য পাওয়া ছিলো খুব সহজ বিষয়। কারণ সারারাত তিনি লাইব্রেরিই পাহারা দেননি, বরং তিনি জ্ঞানেরও পাহারা দিয়েছেন! উদয় হাকিম কয়েক হাজার বইয়ের একটি জীবন্ত লাইব্রেরি। তিনি বলেন, আমি মাদরাসায় পড়িনি কিন্তু মুসলমানদের কুরান, হাদিসের ছয়খানা প্রসিদ্ধ কিতাব আমার প্রায় মুখস্ত ছিলো। লালন গীতি, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত, ক্লাসিক্যাল বাংলা গান আমার খুব প্রিয়। আমি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে আমার প্রাণ খুঁজে পাই’।

তিন ভাই। ভাইদের মাঝে উদয় হাকিম সবার বড়। ছোট বেলা থেকেই তার মাথায় কাজ করতো বাড়িতে কিছু আয়ের চিন্তা। স্বাবলমী হওয়ার চিন্তা। তাই কিশোর বয়সেই একটি লাইব্রেরির রাত্রীকালীন প্রহরী হিসেবে কাজ নিলেন। মাসে ৭০০ টাকা মাইনে পেতেন। তা দিয়ে ভালোভাবেই পড়াশোনা চালিয়ে নিতেন। সাহায্য করতেন পরিবরাকেও। উদয় হাকিম বলেন, ‘টাকা যতোটা না পেতাম, তার চেয়ে বেশি পেতাম জ্ঞানার্জনের সুযোগ। এতো বই কিনে পড়ার সুযোগ আমার হতো না। তাই পেটের ক্ষুধা জ্ঞানার্জনের ক্ষুধা পূরণ করে মিটাতাম’।

এসএসসি পলীক্ষায় ভালো ফল করার পর অনেকেই আসতেন তাকে দেখার জন্য। এবার উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার পালা। পরিবারের সবাই চাইলো স্থানীয় কোন এক কলেজে ভর্তি হই আমি। কিন্তু এখানে একটু স্বার্থপর হলাম। জীবনে একটু বড় হওয়ার জন্য। আমি চলে আসলাম ঢাকায় ভালো কলেজে পড়ার জন্য। ভর্তি হলাম ঢাকা কলেজে।

এবার জীবনের সাথে যুদ্ধ করার সময়। গ্রামে না হয় গার্ডের চাকরি করে চলতেন। ঢাকায় এসে রেডিমেট চাকরি কোথায় পাবেন তিনি। ছোট বেলা থেকে তিনি খেলাধুলায় খুব পটু ছিলেন। মানুষ তাকে অনেক দূরে দূরে থেকে এসে ভাড়া করে নিতেন। তিনি বলেন, গার্ডের চাকরি অনিচ্ছা হলেও ছাড়তে হলো আমাকে। কিন্তু ঢাকায় নিয়মিত থাকতে পারতাম না। ফুটবল ক্রিকেট খেলে যা কিছু আসতো তা নিয়েই চলে আসতাম ঢাকায়। তাই সপ্তাহে তিন বা চারদিন থাকি ঢাকায় আর বাকি দিনগুলি গ্রামে গিয়ে থাকতাম।

কিন্তু এভাবে উদয় হাকিমের দিন চলাটা ক্রমেই অসম্ভব হতে থাকলো। তিনি মাঝে টাকার ভাবনায় বাউন্ডুলে হতে থাকলেন। কিন্তু স্বপ্ন তাঁর সফল হওয়া। কারণ সবার অমতে তিনি বাড়ি থেকে চলে এসেছেন। তিনি বলেন, পাঁচ বছরের লাইব্রেরি পাহারার জ্ঞান নিয়ে এবং মানসিক বেকারগ্রস্ততা সঙ্গে করে এইচএসসি পরীক্ষা দিলাম। এখানেও ফাস্ট ক্লাস পেলাম। অনেক স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে পড়ার। কিন্তু পয়েন্ট ২৫ এর জন্য ইংরেজি পেলাম না। তাই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে’।

মাধ্যমিক স্কুল জীবনে এতোটাই কবিতা, গল্প ও উপন্যাস পড়া হয়েছে, যে উদয় হাকিমের মাঝে লেখনী শক্তি চলে এসেছে। তাই তাঁর লেখক হিসেবেও ভালো নামডাক রয়েছে। কলেজ জীবন থেকেই খেলাঘর, কঁচিকাঁচার আসর এ যেতেন, লিখতেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন মাসিক পত্রিকা, জাতীয় পত্রিকায় লেখার অভ্যাস রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, প্রথমে ফ্রিতে লিখতাম সব জায়গায়। এরপর এক বড় ভাইয়ের সূত্রে জানতে পারি প্রথমবারের মতো দৈনিক ভোরের কাগজে ফিচার পাতা শুরু হয়েছে। সেখানে আমার লেখার সুযোগ হলো। তাই এই সুযোগটা হাত ছাড়া করলাম না। এখানেই লেখা শুরু করলাম। এখান থেকে এবং অন্যান্য পত্রিকায় লেখে যে কয় টাকা পাই, তা দিয়েই মোটামুটি আমার দিনের পর দিন চলে যায়’।

এভাবেই অনার্স এবং মাস্টার্সে পাস করেন উদয় হাকিম। ইতোমধ্যে তাঁর লেখার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে মিডিয়া পাড়ায়। হঠাৎ একদিন এক বন্ধু উদয়কে এসে বললেন, ‘প্রথম আলো’তে তুমি চাইলে চাকরি করতে পারো’। ১৯৯৯ সালে প্রথম আলো’র জন্মের বছর তিনি সেই সুযোগটাও কাজে লাগালেন। তিনি বলেন, আমি প্রথম আলো’তে খুব সুনামের সাথেই সাবএডিটর পদে চাকরি করতে থাকলাম। পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার কাজের অনেক প্রশংসাও করতেন তিনি। কিন্তু আমি দেখলাম এখানে আমার নিজের কোন সৃষ্টিশীল কাজ হচ্ছে না। তাই ৫ বছর এখানে চাকরি করে ছেড়ে দিলাম।

এরপর তিনি টেলিভিশন মিডিয়াতে রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। প্রথমে তিনি চ্যানেল আই, পরে সিএসবি নিউজ। শেষে কালের কণ্ঠ। এরপর একুশে টিভি, চ্যানেল আই, আরটিভি এবং বাংলাভিশনে চাঙ্ক বা সময় ভাড়া নিয়ে ‘বিজনেস প্রোগ্রাম’ শুরু করেন। তিনি বলেন, সিএসবি নিউজ বন্ধ হয়ে গেলে আমি কিছুদিনের জন্য বেকার হয়ে পড়ি। এরপর প্রথমে আমার কাছে ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘ’ আসে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করতে। আমি আমার স্ত্রীকে এ ব্যাপারটা জানালে, সে আমাকে কম টাকার কাজ হলেও সেটি করার জন্য পরামর্শ দেন। ঐ কাজ করে ভালো আয় হওয়ায় আমি বুঝতে পারি মিডিয়া ব্যবসায় কেমন লাভ হয়। সে থেকে চারটি চ্যানেলে চাঙ্ক ভাড়া করে চালাই এবং ভালো আয়ও করি।

বিভিন্ন টিভিতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার সুবাদে সাংবাদিক হিসেবে উদয় হাকিম দেশের রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে মোটামুটি সবার কাছেই পরিচিত। তাই তাঁর রিপোর্টিং এরিয়া বা বিট হতো প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, নির্বাচন কমিশন, বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং নামীদামি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এই সুবাদে সকল উচ্চ মহলের সাথে তাঁর ভালো সম্পর্কও রয়েছে। তিনি বলেন, সিএসবি নিউজে আমি আওয়ামী লীগের বিট কাভার করতাম। আমার নিউজ দিনের অর্ধেকটা সময় লিড নিউজ হিসেবে প্রচার হতো। আমি চাঙ্ক ভাড়া নিয়ে কাজ করার সময় বাণিজ্য মেলা শুরু হয়। সে সময় সেখানে আমার ফার্মের জন্য বাণিজ্য মেলা থেকে বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য প্রদর্শন করতাম। আমি বাণিজ্য মেলা থেকে তাদের পণ্যের মান ও বিক্রি নিয়ে বিভিন্ন ইভেন্ট প্রচার করতাম। এই ইভেন্ট থেকে মোটামুটি ভালো আয় হতো’।

উদয় হাকিমকে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াল্টন’ খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে তাঁকে তাদের কোম্পানিতে নিয়োগ নেয়ার আমন্ত্রণ জানায়। তখন তিনি একইসঙ্গে কাজ করতেন দৈনিক কালের কণ্ঠে।

২০১০ সালে মাত্র ২৫ হাজার টাকা বেতনে ওয়াল্টন থেকে কাজের প্রস্তাব আসে তাঁর কাছে। প্রথমে রাজি না হলেও পরবর্তী সময়ে প্রতিদিন দুএক ঘন্টা সময়ের জন্য সুযোগটি নিয়ে নেন তিনি। এভাবে সকালে রিপোর্টিং এর জন্য সময় ব্যয় করেন, দুপুরে ওয়াল্টনে সময় দেন, দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কালের কণ্ঠে সময় দেন এবং সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এই সময়টা নিজের ফার্মে ব্যয় করেন। উদয় হাকিম বলেন, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে সফলতা ধরা দিতে বাধ্য। তিন চার জায়গায় কাজ করতাম। কখনও মনে হয়নি আমি কোন কোম্পানির স্বার্থে করেছি। আমার মনে হয়েছে এই কাজগুলো আমার। আমি আমার উন্নতির জন্য করেছি।

এরপর ওয়াল্টন উদয় হাকিমের কর্মদক্ষতা দেখে তাঁকে পার্মানেন্টভাবে কাজ করতে বলে। তিনি পুর্ণকালীন ওয়ালটনে কাজ শুরু করেন। ছেড়ে দেন কালের কণ্ঠ। কিছু দিন পর বাংলাদেশে শুরু হয় বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্টইন্ডিজের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। সেখানে উদয় হাকিম প্রথমবারের মতো ওয়াল্টনকে স্পন্সর প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখেন। এতে কোম্পানির ব্র্যান্ড ইমেজ এবং বিক্রি বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, আমার জনসংযোগ দক্ষতা দেখে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ আমাকে পদোন্নতি দেয়।

বাংলাদেশের প্রথম দেশজ একটি ইলেক্ট্রনিক কোম্পানি ওয়াল্টন, যেটি কিনা এখন বিক্রি এবং মার্কেটিং এর দিক থেকে দেশে প্রথম স্থানে রয়েছে। এখন আর সেই লাইব্রেরির রাত্রিকালীন গাইট কিশোর ছেলেটির ১০ টাকা ৫০ টাকা ইনকাম করে পরিবার চালাতে হয় না। তার নিজের ফার্ এখণ চালান তার স্ত্রী। তিনি নিজে ওয়ালটনের ক্রিয়েটিভ এ্যান্ড পাবলিকেশন বিভাগের প্রধান এবং তার ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, আমরাই বাংলাদেশে প্রথম, যারা বলতে সাহস করেছি, ‘আমার পণ্য আমার দেশ, মেড ইন বাংলাদেশ’। তার সম্পাদনায় শুরু হয় বাংলাদেশে ইতিবাচক সংবাদের অন লাইন মুখপত্র রাইজিংবিডিডটকম।

সাফল্যে গাঁথা জীবনের অধিকারী উদয় হাকিমের আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি এখন বাংলাদেশের স্বনামধন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’ এর জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের একজন খণ্ডকালীণ শিক্ষক। তাঁর জীবনে সাংবাদিকতা পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। জীবনের প্রয়োজনে যেখানেই তিনি হাত দিয়েছেন পরিশ্রম ও কর্মকৌশল দিয়ে সোনা ফলিয়েছেন। এখনও এই অদম্য মেধাবী মানুষটি তাঁর কর্মের মধ্যদিয়ে একটি সোনালী স্বপ্ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন।

তার প্রথম পছন্দ ভ্রমণ। তিনি বিশ্বাস করেন ভ্রমনকারী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দরবেশ। একারণে সুযোগ এলেই দেশ-বিদেশ চষে বেড়ান তিনি। এ পর্যন্ত ২৫ টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। ভ্রশন বিষয়ে লেখালেখিও করছেন সমান তালে। তার প্রকাশিত বই রয়েছে ৬ টি। ভবিষ্যতে তিনি ভ্রমণ নিয়ে লিখতে চান আরো। তিনি গান পছন্দ করেন। গান লিখেনও। জীবনমুখী বাংলা গানের শ্রেষ্ঠ শিল্পী নচিকেতা সম্প্রতি উদয় হাকিমের লেখা গান দিয়ে একটি এ্যালবাম করেছেন। গেয়েছেন ফেসবুক নামে একটি জীবনমুখী গান, যেটি উদয় হাকিমের লেখা। যা এখন ইউটিউবে দেখা যাচ্ছে। তার কাছে লড়াইয়ের নাম ই জীবন; পরিশ্রমই সব। যে কারণে এখনও লড়ে যাচ্ছেন। পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ছুটছেন সফলতার পেছনে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Share.

Leave A Reply

10 × one =