আয়েশা : মৃত মানুষটারেও দেখতে দিলেন না

0

সাদমান শাওন

কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের উপন্যাস ‘আয়শামঙ্গল’ অবলম্বনে নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালনায় ঈদের জন্য তৈরি করেছেন টেলিছবি ‘আয়েশা’। চ্যানেল আইতে প্রচারণার পর, এটি নিয়ে চলছে চারদিকে প্রশংসা। ঈদ উপলক্ষে ভাইব্রাদার এক্সপ্রেস সিরিজের একটি এটি।
আয়েশা এমন একটি গল্প যেই গল্প বইয়ে প্রকাশ আছে কিন্তু বইয়ের বাহিরের কিছু মানুষের কাছে অজানা অনেকের। বইয়ের পাতা থেকে তুলে টিভি পর্দায় আনলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। যারা বই পড়েছেন অনেকে বলছেন বইয়ে সাথে কিছুটা অমিল আছে সবটুকু নয় কিন্তু এও বলার অপেক্ষা রাখেনা কি পরিমাণ ভালো লেগেছে টেলিছবিটি মানুষের। যা টিভি, ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যম দেখলেই বুঝা যায়। বইয়ের পাতা থেকে ফিল্ম এ আনলে কিছুটা কমে আসে কিন্তু মূল গল্প ঠিক রেখেই তা নির্মিত হয়।

আয়েশা গল্পের মুলে দেখেছি, ১৯৭৭ সাল। শুরুতেই দেখা যায় কর্পোরাল হিসেবে বিমান বাহিনীতে কর্মরত তরুণ জয়নাল বিয়ে করেন গ্রামের মেয়ে আয়েশাকে। গ্রামে বাস করলেও আয়েশা শিক্ষায়, মানবিক গুনাবলিতে অটল। খুব দ্রুতই তাদের বিয়ে হয়। সংসারে আয়েশা যখন স্বামীর সাথে শুয়ে গল্প করছে তখন তাকে বলতে শোনা যায়- ‘স্বামী স্ত্রী হইলো গাছের মতো। দুইটা গাছ উপর থেকে আলাদা দেখালেও শেকড়ে শেকড়ে তাদের যোগাযোগ আছে। এক শিকড় আরেক শিকরকে খাওন দেয়, দুজন ঝগড়া করে, ভালোবাসে, ভাবের আদান প্রদান করে। স্বামী স্ত্রী হচ্ছে সেই রকম। মনের মিল থাকলে শেকড়ে শেকড়ে সব জানা জানি হয়ে যায়।’

কিছু দিন বাদেই এক রাতে জয়নালের ডাক আসে। জয়নাল বের হয়ে যায়। এরপর আর খবর নেই! কি দুশ্চিন্তায় দিন যায় আয়েশার চরিত্রে তা হারে হারে অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা তার অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছে। চাপা কান্না। দাঁতে দাঁত চেপে নিঃশব্দে কান্না। না দেখলে বুঝবেন না। অথচ তার আগেই জয়নাল বলেছিলো তার স্ত্রী আয়েশাকে যে, সে এর সাথে জড়িত না। সে তার চীফকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু উল্টো তাকেই আটকে রাখা হয়। এদিকে আয়েশা এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়।কিছুতেই স্বামীকে আটক থেকে উদ্ধার করতে পারছে না। জয়নাল চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। তার অভিনয় নতুন করে বলার কিছু নেই। অসাধারণ।

আয়েশার গর্ভে সন্তান আসে এক সময় ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে অফিসারকে মিনতি করে জয়নালকে খবরটা জানাতে। কিন্তু অফিসার উপর থেকে নানা সমস্যার কারনে জানাতে না পেরেও আয়েশাকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেয়। সেই দৃশ্য চোখে কান্না আসতে বাধ্য।

সেই কিন্তু গর্ভে সন্তান নিয়ে বাধ্য হয়ে আয়েশাকে গ্রামে ফিরতে হয়। তখন আয়েশার পিতা তাকে একটা আয়না দেয়। আধ্যাত্বিকতায় বিশ্বাস থেকে সে ওই আয়না এনেছে। তার বিশ্বাস ওই অায়নায় অলৌকিকভাবে হারানো মানুষের খবর পাওয়া যায়। মানুষের সামনে যখন আর কোনো পথ খোলা থাকেনা তখন সে অলৌকিক কোনো কিছুর আশায় বসে থাকে, আয়েশাও তাই করতে থাকে।

সাত মাস পর ক্যান্টনমেন্ট থেকে চিঠি আসে গ্রামে আয়েশার কাছে । চিঠিতে জানতে পায়, তার স্বামীর সাজা হয়েছে কিন্তু কি সাজা কিছুই লিখা নেই। আবারো ঢাকায় ক্যান্টনমেন্টে এসে অফিসারের কাছে আসে। অনেক আকুতি মিনতির পর জানতে পায় তিনি আর নেই। গুলি করে মারা হয়েছে। আয়েশার বুকটা ফেটে কিজে হাহা কার তৈরি হয় সেই দৃশ্য না দেখলে বুঝবেন না। শেষে আয়েশা জানতে চায় তার স্বামীর লাশ কোথায়? উত্তরে জানতে পায় তাকে দাফন করাও হয়েগেছে। কোথায় দাফন হয়েছে তাও বলেনি অফিসার। কর্মকর্তাকে আয়েশাকে বলে, ‘জীবিত মানুষটারে দেখতে চাইলাম, দিলেন না। মৃত মানুষটারেও দেখতে দিলেন না। কবর কোথায় সেটাও বলতেছেন না। আমরা কবর জিয়ারতও করতে পারবো না? এটা কোন বিচার, স্যার?’

গ্রামের ফেরার পথে একটি অচেনা পথে দাঁড়িয়ে কবর জিয়ারত করে। তখন তার আত্মীয়র প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘আমিতো জানিনা আমার স্বামীর কবর কই? আমার কাছে এই ৫৬ হাজার বর্গ মাইলই স্বামীর কবর।’

যে টেলিছবি নিয়ে এত প্রশংসা চারদিকে, তার নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কী ভাবছেন? ফেসবুকে এই নির্মাতা লিখেছেন, ‘ফিল্মমেকার হিসেবে আমরা কী করি আসলে? সময়ের চিহ্নটা ইতিহাসের বুকে এঁকে যাই। যে রকম করে আদিম মানুষেরা যে রাস্তা দিয়ে পার হতো, সেখানে একটা চিহ্ন এঁকে যেত। যেন ইতিহাসের কাছে সাক্ষ্য দেওয়া, এই সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা এসেছি। যে সময়টাতে আমরা বাস করছি, বাস করতাম, অথবা করব, তার ওপর একটা মার্কার পেনের চিহ্ন রেখে আমরা সবাই হারিয়ে যাব। এই তো খেলা। বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার সময়ের আনন্দ, বেদনা, অসহায়ত্ব এসব যেন আমাদের গল্পে উঠে আসে—বিনীতভাবে আমরা সেই চেষ্টা করি। “আয়েশা”ও এমনই একটা চেষ্টা।’

Share.

Leave A Reply

− five = 5