আলেকজান্ডার দি গ্রেট নাকি মৃত্যুর পথপ্রদর্শক?

0

সিনথিয়া করিম – 
গ্রিস দেশের ছোট একটি রাষ্ট্রের অধিপতি ফিলিপের পুত্র বীর আলেকজান্ডার। তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য ঐতিহাসিকরা তাঁকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতির আসনে বসিয়েছেন। তাঁকে আলেকজান্ডার দি গ্রেট এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।

খ্রিষ্টপূর্ব চার বছর আগের কথা। গ্রিস দেশ তখন অসংখ্য ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত। এমন একটি রাষ্ট্রের অধিপতি ছিলেন ফিলিপ।ফিলিপ ছিলেন বীর, সাহসী, রনকুশলী। সিংহাসন অধিকার করার অল্পদিনের মাথায় গড়ে তোলেনএকসুদক্ষ সেনাবাহিনী।পরবর্তীতে অধিপতি ফিলিপের পুত্রই হয়ে ওঠেন , আলেকজান্ডার দি গ্রেট।

আলেকজান্ডার খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫৬ সালে জন্মগ্রহন করেন।ছেলেবেলা থেকেই তাঁর ছিল সুগঠিত দেহ। বাদামিচুল, হাল্কারঙ।এক আশ্চর্য বিষয় লক্ষ্য করা যেত তাঁর সম্পর্কে।আলেকজান্ডারের শরীর থেকে সর্বদা একঅপূর্ব সুগন্ধ বের হত।

ফিলিপের ছিল তাঁর পুত্রের শিক্ষার দিকে তীক্ষ্ণ নজর। আলেকজান্ডার ছিলেন যেমন অশান্ত তেমনি জেদি আর একরোখা। শিশু আলেকজান্ডারকে পড়াশুনায় মনযোগী করতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয় তাঁর প্রধান শিক্ষক লিওনিদস্কে। কিন্তু শিক্ষকের কঠোর পরিশ্রমে অবশেষে পড়াশোনায় মনযোগী হয়ে ওঠেন আলেকজান্ডার। সময়ের সাথে তিনি পারদর্শী হয়ে ওঠেন অংকে, ইতিহাসে, অশ্বারোহণ, তিরন্দাজিতে।

বীরত্বের সাথে সাথে তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন। একদিন একজন ব্যবসায়ী একটি ঘোড়া ব্যবসায়ী একটি ঘোড়া বিক্রি করেছিল ফিলিপের কাছে। হিংস্র ঘোড়াটির পিঠে কেউ উঠতে সাহস পাচ্ছিলনা। আলেকজান্ডার লক্ষ্য করলেন ঘোড়াটি নিজের ছায়া দেখে ভয় পাচ্ছে। শেষে তিনি ঘোড়ার পাশে গিয়ে আস্তে আস্তে ঘোড়ার মুখটা সূর্যের দিকে ঘুড়িয়ে দিলেন। তারপর ঘোড়াটিকে আদর করতে করতে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়েন। ঘোড়া থেকে নেমে ফিলিপের সামনে আসতেই ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন তিনি। বললেন তাঁকে এভাবেই নতুন রাজ্য জয় করতে হবে।

ফিলিপ অতিসহজেই বুঝলেন তাঁর ছেলে অসাধারন প্রতিভার অধিকারী। তাই তিনি আলেকজান্ডারের প্রকৃত শিক্ষা সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ফিলিপ আলেকজান্ডার কে মহাজ্ঞানী এরিস্টটল এর কাছে পাঠালেন। দীর্ঘ তিন বছর এরিস্টটলের কাছে শিক্ষা গ্রহন করেছিলেন আলেকজান্ডার। আমৃত্যু গুরুকে গভির সম্মান করতেন আলেকজান্ডার। নিজের গুরুর প্রতি সম্মান জানাতে তিনি বলেছিলেন, এই জীবন পেয়েছি পিতার কাছে। কিন্তু সেই জীবনকে কি করে আরও সুন্দর করে তোলা যায়, সেই শিক্ষা পেয়েছি গুরুর কাছে।

আলেকজান্ডারের বয়স যখন ষোল , ফিলিপ বাজেন্তাইন অভিযানে বের হলেন। পুত্রের উপর রাজ্যের সমস্ত ভার অর্পণ করলেন। ফিলিপের অনুপস্থিতিতে কিছু অধিনস্ত অঞ্চলের নেতারা বিদ্রোহ ঘোষণা করল। কিশোর আলেকজান্ডার বীরের মতন ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিদ্রোহীদের ওপর। এই যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে নতুন দেশ জয় করলেন এবং নাম রাখলেন আলেকজান্দ্রা পলিস।

পিতা পুত্রের মধ্যকার সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। এর পেছনে আলেকজান্ডারের মায়ের প্ররোচনা ছিল যথেষ্ট। আলেকজান্ডারের যখন কুড়ি বছর বয়স, ফিলিপ আততায়ীর হাতে নিহিত হন। এর পিছনে রানি অলিপিয়াসেরও হাত ছিল। ফিলিপ নিহত হতেই সিংহাসন অধিকার করলেন আলেকজান্ডার।

প্রথমেই হত্যা করা হোল নতুন রানির কন্যাকে, নতুন রানিকে আত্মহত্য্যায় বাধ্য করলেন রানী অলিম্পিয়াস। যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাঁর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।

আলেকজান্ডারের বিভিন্ন বীরত্বপূর্ণ অর্জনের ফলে তাঁকে দেশের সমস্ত গুণী মানুষেরা নিয়মিত অভিনন্দন জানাতে আসে। কিন্তু আলেকজান্ডার মহাজ্ঞানী ডায়োজেনিসের সাথে সাক্ষাতের জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আলেকজান্ডারের কাছে না যাওয়াতে আলেকজান্ডার নিজেই গেলেন তাঁর কাছে।

বাড়ির সামনে একটি খোলা জায়গায় রোদ পোহাচ্ছিলেন বৃদ্ধ দার্শনিক। আলেকজান্ডার তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, তিনি কি আলেকজান্ডারের কাছে কিছু প্রার্থনা করেন কিনা। ডায়োজেনিস শান্ত গলায় বললেন, “ আপনি আমার আর সূর্যের মাঝে আড়াল করে দাঁড়াবেন না, এর বেশি আর কিছু প্রার্থনা করিনা।“ দার্শনিকের এই কথায় একটু ও রেগে না গিয়ে তিনি বললেন, “ আমি যদি আলেকজান্ডার না হতাম তাহলে ডায়োজেনিস হতাম’।

আলেকজান্ডারের বৃহত্তম অভিযান গুলোর মধ্যে একটি ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম সাম্রাজ্যের অধিপতি দারিয়ুস এর বিরুদ্ধে। অভিযানে আলেকজান্ডারের সৈন্য সংখ্যা ছিল দুই লাখ। অপরপক্ষে দারিয়ুস এর সৈন্য দশ লাখের মত হলেও তাঁদের মাঝে ছিল সহিংসতার অভাব। দারিয়ুস নিজেও রণকুশলি ছিলেন না। সম্পূর্ণ পরাজিত হয়ে দারিয়ুস তাঁর স্ত্রী ও কন্যা রেখে পালিয়ে যায়। রাজপ্রাসাদের সবাইকে বন্দি করা হল। দারিয়ুসের মা, স্ত্রী, দুই কন্যাকে বন্দি করে আনা হয় আলেকজান্ডারের সামনে। আলেকজান্ডার তাঁদের সসম্মানে মুক্তি দিয়ে প্রাসাদে ফিরিয়ে দেন।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৮ সালের মধ্যে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য তাঁর অধিকারে এলো। কিন্তু ২ রা জুন খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন আলেকজান্ডার। এগারদিন পর মারা গেলেন আলেকজান্ডার। মাত্র ৩৩ বছর বেঁচেছিলেন তিনি। আলেকজান্ডার চেয়েছিলেন সমগ্র পৃথিবীব্যাপী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং সেই বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যের অধিনশ্বর হতে। অতিমানবীয় এই ইচ্ছাকে পূর্ণ করার জন্য তিনি তাঁর সল্প কালীন জীবনের অর্ধেকটাই ব্যয় করেছেন যুদ্ধে।

প্রকৃত পক্ষে আলেকজান্ডার সভ্যতা সংস্কৃতি সম্বন্ধে উৎসাহী ছিলেন না। নিজের খ্যাতি গৌরব প্রভুত্ব ছাড়া কোন বিষয়েই তাঁর কোন আগ্রহ ছিলনা।এক পৈশাচিক উন্মাদনায় তিনি শুধু চেয়েছিলেন পৃথিবীকে পদানত করতে। তিনি যা কিছু করেছিলেন টা শুধু নিজের গৌরবের জন্য, মানব কল্যানের জন্য নয়। হাজার হাজার মানুষকে শুধু নিজের ইচ্ছা চরিতার্থ করার জন্য হত্যা করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ইতিহাসের পাতায় একজন হত্যা ও মৃত্যুর পথপ্রদর্শক হিসাবে থাকবেন।

Share.

Leave A Reply

sixty three + = sixty four