‘আমি মানুষ’ জীবনের মিল, অমিল ও গড়মিলের আখ্যান

0

হাকিম মাহি

‘জীবন বনাম মৃত্যুতে, মৃত্যুই মরে এবং জীবনই বাঁচে। আমি ব্যক্তি হিসেবে অবশ্যই মরবো; কাল, নয়তো পরশু: তবুও তোমার আমার মৃত্যুহীন স্বপ্নের কোন মৃত্যু ঘটবে না। এ সত্যের কোন ব্যত্যয় নেই’। জীবন নিয়ে এমন দার্শনিক উক্তি যার, সে মানুষটির একসময় দেহের মৃত্যু ঘটেছে কিন্তু তাঁর জীবনের মৃত্যু ঘটেনি। তিনি হলেন ‘আমি মানুষ’ বইটির লেখক সরদার ফজলুল করিম। একাধারে তিনি ছিলেন লেখক, অনুবাদক, দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং একটি জীবন্ত লাইব্রেরি। তাঁর জন্ম ১৯২৫ সালের ১ মে বরিশালের আটিপাড়ায়।

‘আমি মানুষ’ বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এটি উৎসর্গ করা হয়েছে মানুষকেই। বইটি মূলত লেখকের দিনলিপি। এতে ফুটে উঠেছে তাঁর ব্যক্তি জীবনের নিত্যদিনের কর্ম। তাইতো তাঁর কর্মস্থল সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া, বাজারে যাওয়া, ব্যাংকে দৌড়ানো সবকিছু একই সুতোয় বাঁধা রয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে যান্ত্রীক জীবন যতোটা কঠিন মনে হয়েছে, তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে ততোটাই জীবনকে সহজভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন পাঠকের সামনে।  জীবনের সাথে লড়াই করে মানুষ হতে চেয়েছেন বার বার। তাই বইয়ের পরতে পরতে জীবন দর্শনের মিল, অমিল ও গড়মিলের উদাহরণ টেনেছেনও বার বার।

বইটিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু করে আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ঢাকার রিকশাওয়ালা, সিএনজি ড্রাইভার ও কাঁচা বাজারের সহজ সরল মেয়েটিও স্থান পেয়েছে তাঁর খণ্ড খণ্ড গল্পে। তাঁর প্রিয় মানুষ এম এম আকাশ, মুনতাসীর মামুন, প্লেটোর লেখা গল্প ও শিরোনামগুলো তাঁর বইটির দর্শনকে পাঠকদের সামনে আরও বাস্তব করে ফুটিয়ে তুলতে সহযোগিতা করেছে।

সত্যের মতো বড় কঠিনকেউ তিনি নিজের বেলায় ও অন্যের বেলায় প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করেননি। তিনি বলেন, ‘আমাদের ছাত্রছাত্রীরা খুব সহজ সরল। ওরা কম্পুটার বুঝে কিন্তু বই কাকে বলে বুঝে না। ভাইবা ভোসি বা মৌখিক পরীক্ষার সময় যদি জিজ্ঞেস করি, বল বই কাকে বলে? তখন ঘাবড়ে গিয়ে মাথা চুলকায়। কোন কথা তৈরি করতে পারে না’। তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘যে দেশে যে বই পাঠ করা হয় না, অক্ষম আমার বাসার মত কেবল স্তুপ করে রাখা হয়, তা বস্তু বটে তবে বই নয়। তাই বলছিলাম, যে বই পাঠ করা হয় না, সে বই, বই নয়। কেবল তাই নয়, যে বই পঠিত হয়, কিন্তু তাঁর বিষয় বস্ত আলোচিত হয় না, সে বইও বই নয়’। তিনি যে ‘কৃষকের ছেলে’, ‘পঙ্গু’ এবং ‘বইয়ের বলদ’, তাও তিনি তাঁর পাঠকের কাছে স্বীকার করেছেন অকপটে।

এই বইটি কেবল তাঁর দর্শনই নয়, ইতিহাসও। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় বন্যার পরিস্থিতির সাথে তুলনা করতে গিয়ে সরদার ফজলুল করিম বলেন, ‘সেই পুরানের কাহিনী। সমস্ত পৃথিবী পানিতে ডুবে গিয়েছিলো। মানুষসহ সমস্ত প্রাণিকুল। নুহ (আ.) একটি বড় বজরা তৈরি করেছিলেন। আর তাতে সমগ্র প্রাণিকুলের একটি করে জোরা রক্ষা করেছিলেন। নূহের কিশতির সেই প্রাণিকুলেরই জীবিত প্রজন্ম আমরা’।

তিনি ধ্বংসের কথা বলেননি, তিনি বলেছেন সৃষ্টির কথা। তিনি হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, শত্রুতার কথা বলেননি, তিনি বলেছেন ভালোবাসার কথা, সহমর্মিতার কথা। তাই তিনি মুসলিম বিশ্বের উপর যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনের হামলাকে প্রতিবাদ করেছেন আমি মানুষ বইটি লেখার মধ্যদিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার হত্যাযজ্ঞের শিকার শুধু মুসলিম নয়, ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর নির্যাতিত সকল মানুষই হচ্ছে মার্কিন হত্যাযজ্ঞের মূল লক্ষ্য। ৯/১১ পেন্টাগনের কীর্তি। সে সত্য ক্রমান্বয়েই প্রকাশিত হচ্ছে। তাই আমি বলবো, হোসেনুর রহমান সাহেবের রচনার মূল শিরোনাম হওয়া প্রয়োজন আমেরিকা বনাম মানব সভ্যতা’। আর সাথে সাথে তিনি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন। তাই নিজেকে তিনি প্রথমে মানুষ, পরে কমিউনিস্ট এবং একজন শুদ্ধ বাঙ্গালি বলতে পছন্দ করতেন।

সরদার ফজলুল করিম তাঁর দার্শনিক চোখে এরিস্টটলকে আড়াই হাজার বছর বয়সের বৃদ্ধ বলেছেন। তাঁর উক্তিতে বোঝা যায় যে এরিস্টটল আজও বেঁচে আছেন। তিনি লেখেন, ‘এরিস্টটলের জন্য আমার মায়া হয়। আড়াই হাজার বছর বয়সী বৃদ্ধ এরিস্টটল। অবশ্য তিনি আমাকে আজও মায়া করেন’। বইটিতে লেখক ব্যাঙ্গ করে উল্লেখ করেছেন তাঁর অবাধ্য হাত পড়েছে সেই আড়াই হাজার বছর বয়সী বৃদ্ধ এরিস্টটলের কিছু বই ‘পলিটিকস’, ‘অ্যানশিয়েন্ট এনসাইক্লোপিডিয়া’ এবং মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের ‘সুন্দরের সংগ্রাম ও বুদ্ধিবাদের ট্রাজেডি’ আরও অনেক বইয়ের উপর,।

অপ্রাসঙ্গিকতা: পুরো বইটি পড়ে মনে হয়েছে বইটির শিরোনামের সাথে এবং বইটির উপজীব্য বিষয়ের মধ্যে গড়মিল রয়েছে। লেখক বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘আমি মানুষ’ অথচ তিনি এখানে আলোচনা করেছেন দেশের এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বল, গোত্র, শ্রেণি ও ধর্ম নিয়ে। এটি যদিও মানুষের নিত্যদিনেরই কর্ম, তবুও পাঠকের কাছে মনে হবে এগুলো অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা। বইটির শিরোনাম পড়ে একজন পাঠক আশা করবে এখানে আলোচনা হবে মানুষের জীবন এবং কর্ম নিয়ে দার্শনিক চিন্তা ধারার একটি  মিথস্ক্রিয়া ও এর উদাহরণ। যেটি মানুষকে মানুষ হয়ে উঠার পথে সহযোগিতা করবে। তা পাওয়া যায় নি বলা যাবে না। তবে যতটুকু পাওয়া গেছে, তা প্রত্যাশার চেয়েও অতি নগন্য।

পক্ষপাতদুষ্টতা: বইটির মধ্যে মানুষের পরিচয়ের চেয়ে পক্ষাবলম্বনই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দল। ২১ আগস্টকের বর্ণনা দিতে গিয়ে সরদার ফজলুল করিম লিখেছেন, ‘আমাদের জাতীয় জীবনে আগস্ট মাসটা যেন ক্রমান্বয়ে অধিক পরিমাণে অপয়া একটা মাসে পরিণত হচ্ছে’।

আত্মম্ভরিতাঃ পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ নিজের প্রশংসা শুনতে এবং নিজের প্রশংসা করতে ভালোবাসেন। এর মাঝেও ঐ মানুষগুলোই শ্রেষ্ঠ, যারা কম হলেও নিজের প্রশংসামূলক সমালোচনার উর্ধে থাকেন। এই বইটির অনেক জায়গায় লেখক তাঁর নিজের প্রশংসায় মগ্ন হয়েছেন। যেমন- লেখকের বন্ধু ন্যাপের মুজাফফরের সাথে তাঁর কথোপকথন, ‘একদিন তিনি আমার বিরুদ্ধে অনুযোগ করে বললেন, আপনার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ আছে। আমি বললাম কী অভিযোগ? সে বললো, আমি গতরাতে ঘুমাতে পারিনি। ক্যান? আপনি যে আমাকে প্লেটোর সংলাপ দিলেন, তা আমি শেষ না করে ঘুমাই কেমন করে?’ তিনি আরও বলেন, ‘রাত দশটার দিকে মুজাফফর আমাকে ফোন দিয়ে আধঘন্টা ধরে আমার ‘প্লেটোর সংলাপ’ এর প্রশংসা করলেন’।

সংকীর্ণতা ও হীনমন্যতাঃ এখানে লেখকের ব্যক্তি জীবনের বাইরে মাঝে মাঝে একটু গেলেও সীমাবদ্ধ রেখেছেন। পুরো বইটি তাঁর নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয়েছে লেখন আমিত্ব থেকে বের হতে পারেননি। বইটিতে তাঁর নিজের ছেলেকেও অনেকটাই প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন-‘হ্যা, মানুষ মানুষের জন্য’ এ প্রবন্ধের প্রথমেই লিখেছেন, ‘১২ টার সময় যেতে হবে মগবাজার। আমার অবুঝ ছেলের বাসায়’। আবার ‘আমাদের দেয়াল ক্যালেন্ডারের সংস্কৃতি’ নামক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমার অবুঝ ছেলের ধাক্কাটা গত রাতে সামলেছি’। পাঠকের কাছে মনে হবে এটির এখানে প্রাসঙ্গিকতা ছিলো না।

সকল সমালোচনার উর্ধে লেখকের লেখায় ৫ বছরের একটি শিশুর ধর্ষণ বিরোধী মনোভাব ও দেশপ্রেম বইটিকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করে। সরদার ফজলুল করিম বলেন, শতাংশ হিসেবে ৯৯% শতাংশ যদি অমানুষ হয়, হত্যাকারী হয়, ধর্ষক হয়, তবুও মুনতাসির এবং আমি বিশ্বাস হারাবো না। মানুষ হওয়ার এবং মনুষ্য সমাজ তৈরির স্বপ্নকে আমরা পরিত্যাগ করবো না। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি, ভালবাসবো। বহু আলোচিত ও সমালোচিত  ‘আমি মানুষ’ বইটির লেখক সরদার ফজলুল করিম ২০১৪ সালের ১৫ জুন মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তাঁর কৃতকর্মের জন্য আজও অমর। কারণ তিনি বলেছেন, তোমার আমার মৃত্যুহীন স্বপ্নের কোন মৃত্যু ঘটবে না’।

লেখক: শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ।  (hakimmahi2017@gmail.com)

Share.

Leave A Reply

2 × four =