আমি তৃতীয় লিঙ্গ, আমার মুক্তি কোথায়?

0

নতুন কিছু ডেস্ক।। 

এখন পৌনে পাঁচটা বাজে, ভোর পৌনে পাঁচটা! মসজিদে মসজিদে ফজরের আযান হচ্ছে। এসেছি ৪টায়। বাসা থেকে বের হয়েছি তারও আগে। এসেছি খিলগাঁও এর খিদমাহ হাসপাতালে। বন্ধু নাজনিনের মা অসুস্থ তাই ডাক্তার দেখানোর জন্য সিরিয়াল নিতে এসেছি। এর আগেও একদিন এসেছিলাম, সিরিয়াল নেয়া শুরু হবে ভোর পাঁচটা থেকে। বাসা থেকে বের হয়ে তেজগাঁ গুলশান লিংক রোডে উঠতেই দুইপাশে বাসের দীর্ঘ সারি। কাছের বাসস্ট্যান্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাসগুলোকে এখানেই পার্কিং করে রাখা হয়। কিছুটা আলো আঁধারি এ জায়গাটা। রাত সাড়ে তিনটা, ধীরগতিতে সাইকেল চালাচ্ছি।

দুটি বাসের মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। সেখান থেকে বেরিয়ে এলো আজকের গল্পের চরিত্র। হাত বাড়িয়ে চোখের ইশারায় আমার সাইকেলের গতিরোধ করলো সে। আমার বুঝতে বাকি রইলো না সে কে! সুশ্রী, সুন্দর মুখাবয়ব, বেশভূষাও ভালো। বিপরীত লিঙ্গের যে কেউই তার দিকে দ্বিতীয়বার তাকাবে। সাইকেল থামালাম। বললাম, কী চাই?  যদিও আমি জানি সে কী চায়! অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো আরও একজন! সরাসরি বললো, কাজ করবা? আমি অবাক না হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী কাজ? এবার ওদের অবাক হবার পালা, আর সেই সাথে হাসির ফোয়ারা। যেনো এমন হাসির কথা ওরা আর কোনোদিন শোনেনি!

দ্বিতীয় জনের শারিরীক গঠন আর কণ্ঠস্বর শুনে বুঝে নিলাম এরা তৃতীয় লিঙ্গের হিজরা সম্প্রদায়। কিন্তু প্রথম জনকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। কিছুটা সতর্ক হলাম। কারণ, এরা মাদক ব্যবসাসহ বড় ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে প্রায়ই। এদের সাথে আরো কেউ আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করলাম। আমি সাইকেল চালিয়ে চলে আসতে পারতাম, কিন্তু ততক্ষণে আমি এদের ব্যাপারে কিছুটা কৌতুহলি হয়ে উঠেছি! তাই কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই কথা বলতে শুরু করলাম এদের সাথে। হাসি থামতেই আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, কী কাজ করো তোমরা? প্রথমজন কোনো ভণিতা না করে স্পষ্ট উচ্চারণে ইংরেজিতে বললো, ওর কাজ কী? বললো, আর তুমি যা চাও। কিছুটা স্বাভাবিক কণ্ঠে বললাম, কোথায়? কেন? এখানেই! বলে দুই বাসের মাঝখানের ফাঁকা জায়গার দিকে ইঙ্গিত করলো সে।

প্রথমজনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার নাম? এ্যানি আমার নাম। তুমি এই কাজ কেনো করো? আমার এই প্রশ্নে দ্বিতীয় জনকে খুব হতাশ দেখালো! বিশ্রী গালি দিয়ে সে প্রথমজনকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললো, ‘চল যাইগা’ আইছে! কিন্তু এ্যানি ওর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি আমাকে কোনো কাজ দিবেন? আপনার বাসা বা অফিসে? ওর কণ্ঠের দৃঢ়তায় চমকে গেলাম! কিছুটা অপ্রস্তুতও! কী জবাব দিবো আমি! দ্বিতীয় জন আবারও এসে গালি দিয়ে এ্যানির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইলো, কিন্তু এ্যানি অনড়।

ও তখন বলেই চলেছে। সরকার সব জায়গায় তৃতীয় লিঙ্গ লিখতে বলেছে, আমাদের ভোটাধিকার দিয়েছে, কিন্তু আমরা কী কাজ করবো, কী খেয়ে বাঁচবো, এ ব্যাপারে আপনাদের কোনো চিন্তা আছে? কেউ কেউ হয়তো কিছু সুবিধা পাচ্ছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সবাই তো সেই সুবিধা পাচ্ছে না। আমরা তো কোনো সুবিধা পাইনা, আমাদের এসব করেই খেতে হয়!

আরও আক্ষেপের কথা শোনালো সে। আগে উপার্জন ভালো ছিলো, ডিমান্ডও ছিলো, কিন্তু বর্তমানে পুরুষরাও সার্জারির মাধ্যমে এ পেশায় যুক্ত হচ্ছে। ফলে, আগের মতো আর উপার্জন হয়না। ও যে সার্জারির মাধ্যমে আসেনি, ও যে আসলেই ওই বিশেষ সম্প্রদায়ের, সেটা বোঝাতে ওর শরীরের ওপরের অনেকটা অংশ অনাবৃত রেখেছে সে। সৌন্দর্য আরও বাড়াতে সেখানে সে করিয়েছে সুদৃশ্য ট্যাটু। এ্যানির গল্পটা আরও দীর্ঘ হতে পারতো, কিন্তু তার সঙ্গীর কারণে হয়নি। এ্যানিকে টেনে নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গ্যালো সে।

বন্ধুরা! এ্যানিরা পাপ করছে না পূণ্য! ভুল করছে না শুদ্ধ! সে তর্কে নাই বা গেলাম। শুধু মনে হচ্ছে, ওরও একটা স্বাভাবিক জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা দরকার। যেখানে আর সবার মতো ওরা স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারবে। স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারবে সবার সাথে। কোনো সন্দেহ নেই, এটা একটা অভিশপ্ত জীবন। তার প্রতিটি পরতে লুকিয়ে আছে শুধুই যন্ত্রনা।

বেশ কিছুদিন আগে পাঁচ দিনের ভ্রমণে গিয়েছিলাম মালয়েশিয়াতে। সেখানে অনেক বিপণি বিতান, চেইন শপ, সুপার স্টোর, আর ফাস্টফুডের দোকানগুলোতে কাজ করতে দেখেছি তৃতীয় লিঙ্গের এদের। ওরা অনেক সম্মান নিয়ে আছে সেখানে। সুস্থ আর স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে তাঁরা। আমাদের দেশের এ্যানিরাও তাঁদের মতো সম্মান নিয়ে সুস্থভাবে বাঁচুক। এই প্রত্যাশাটুকু রইলো।

লেখক: আনমল হোসেন আসাদ

প্রধান সমন্বয়কারী মার্স পার্ক লিঃ

Share.

Leave A Reply

four × ten =