‘অসমাপ্তির গল্প’ একটি উপন্যাস

0

ড. আসিফ নজরুল এর ‘অসমাপ্তির গল্প’ পর্যালোচনা।

একটি অসমাপ্তির গল্পের নায়কের চরিত্র মামুন আর নায়িকা শেরি। ভার্সিটি জীবনের শেষ বেলায়ও দু’জনের মাঝে তেমন ভালোবাসা জমে উঠেনি। মনে রাখার মতো আজও স্মৃতি হয়নি তাঁদের মাঝে। মামুন ভাবছে আর তাঁর মুখ নিয়ে আসছে শেরির গালের কাছে। মামুনের মুখে তীব্র সিগারেটের গন্ধ টের পাওয়া মাত্র সে মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে যায় অন্য পাশে। মামুন এবার অন্য পাশে মুখ নিয়ে আসে। এক হাতে শেরির চেহারা চেপে ধরে। ঝট করে তাঁর ঠোঁট রাখে শেরির গালে। তাঁর গাল যেন জ্বলে যায়। ঠাণ্ডা বরফের মতো জমে থাকে শেরি কয়েকটি মুহূর্ত। এটা কী করলো সে!

গল্পটি পড়লে মনে হবে, এটি লেখকের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সহপাঠীদের মাঝে ঘটে যাওয়া দুষ্ট, মিষ্ট, রাগ ও অভিমানে ঘেরা প্রেমের গল্প। এতে মামুন, শেরি, ইতরাত, কবির, শামীম এই চরিত্রগুলো লেখকের সহপাঠী ও ভালো বন্ধুও বটে। যেমনটি ফুটে উঠেছে গল্পের ফাঁকে শামীমকে গালি দেয়ার মধ্য দিয়ে। লেখকের ভাষায়, হলের সিট নিয়ে গণ্ডগোল হয়েছিল শামীমের সাথে ছাত্রদলের একটা ছেলের। ঘটনাক্রমে শামীম পালিয়ে যায়। শামীমকে খুঁজতে গিয়ে ওরা বলে, কোথায় গেলো শামীম। বাঞ্চোত!

শিক্ষা জীবনের পুরোটা জুড়েই থাকে বন্ধু ও পরিবার জীবনের প্রভাব। এই গল্পটি একজন পাঠককে শুধু গল্পেই সীমাবদ্ধ রাখবে না, বরং নিয়ে যাবে এরশাদের সামরিক শাসন আমলে। সে সময় শুধু দেশের গণতন্ত্র, প্রশাসন ও শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যায় ঘটেনি, বরং তাঁদের প্রেমেও বিশাল বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন। তাইতো গল্পের লেখক আসিফ নজরুল ঐসময়টাকে এভাবে তুলে ধরেছেন, যে এর বিরোধী আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ মানে শেরির সাথে দেখা না হওয়া। এটা যে কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার এরশাদ যদি বুঝত!

এ অসমাপ্তির গল্পের লেখক ড. আসিফ নজরুল বাংলাদেশের একটি পরিচিত মুখ। তিনি এক কথায় একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’ এর আইন বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবে পাঠদানে মুকুট পড়ে রয়েছেন। লেখকের অসমাপ্তির গল্পটি বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত পত্রিকা প্রথম আলো’র ২০১৬ সালের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এটি অসমাপ্তির গল্প নামে নাম করণ, কিন্তু এটি মূলত একটি উপন্যাস। যেটি ২২ খন্ডে লেখা হয়েছে।

পুরো গল্পটির উপজীব্য বিষয় হলো , বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মামুন শেরির অসমাপ্ত প্রেমের গল্প ও মামুনের একজন মেধাবী ভাই শফিকের আমেরিকা যাওয়া নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব। এরশাদের সময়কার স্বৈরশাসনের ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যায়। আর সময়ের ব্যবধানে একজন মানুষ কীভাবে সফল হয় আবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় সেটিও ফুটে উঠেছে এখানে। শেষে, ছোট্ট একটি দুর্ঘটনা কীভাবে একটি জীবন নয়, বরং পুরো একটি পরিবার নিঃশেষ করে দেয়, তারও সচিত্র উদাহরণ টেনেছেন লেখক।

গল্পটি শুরু হয়েছে মামুনের বড় ভাই শফিকের আমেরিকা যাওয়া দিয়ে। আজ শফিকের আমেরিকা যাওয়ার কথা। কিন্তু ভিসা জটিলতায় শফিকের আর আমেরিকা যাওয়া হলো না। মামুন শুনেছে, আমেরিকা গেলে নাকি সবাই বড় লোক হয়ে যায়। সে জন্যই বোধহয় শফিকের আমেরিকা যাওয়ার কথা। কিন্তু না। শফিকের স্বপ্ন সে আইনস্টাইন হবে। তা আর হলো কোথায়! শফিকের বাবা ছেলের মিথ্যা আশ্বাস শুনে শফিককে মারধোর করে। এভাবেই একটি শান্ত পরিবার অশান্ত হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে রাগ, অভিমান ও কলহের পরে লেখক ভালোবাসায় মজিয়ে দেয় পাঠকদের। মানুষ প্রেমে পড়লে নাকি অনেক দিনের প্রিয় ময়লা টিশার্ট ও ছিঁড়া জুতোও গুছিয়ে পড়ে। আর ভালোবাসাও তখন ভেতরের মানুষের সৌন্দর্যটা বাইরের জীবনটাকে গুছিয়ে ফেলে। তেমনি মামুনও ঝড়ে পড়া কাকের মতো অবস্থা থেকে শেরির প্রেমে সুদর্শন হয়ে ওঠে।

ভালোবাসা আর ভালোলাগা যে জাত-পাত, রাজা প্রজা, গুরু শিষ্য মানে না, তারই নমুনা লেখক তুলে ধরেছেন। তাইতো সদ্য ইংল্যান্ড থেকে পিএইচডি করা শরিফুজ্জামান স্যার শেরির রূপে, গুণে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়ে যায়। তাই ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে স্যার শেরির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

একদিনের জন্যও ক্লাস বা ভার্সিটি বন্ধ হলে দুটি নিষ্পাপ ভালোবাসার অব্যক্ত কান্নায় নহর বয়ে যায়। এ ভালোবাসাও একসময় দু’জনের ভুল বোঝাবুঝিতে দুই মেরুর সমান দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। মামুন শেরির গালে চুমু দিলে শেরি ক্ষেপে যায় এবং কষে মামুনের গালে চড় বসিয়ে দেয়। এভাবেই বাড়তে থাকে দূরত্ব।

অনেক দিন হয় কেউ কারো খবর নেয় না। হঠাৎ একদিন বন্ধু রবিন একটি শোক সংবাদ নিয়ে আসে। সেটি অন্য কারো নয়, শেরি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তাও সে একা নয়, পরিবারসহ। এভাবেই লেখক আসিফ নজরুলের অসমাপ্তির গল্পটির সমাপ্তি ঘটে। গল্পটির পরতে পরতে হাসি, ঠাট্টা, রাগ অভিমানের শিল্প সুনিপুণভাবে অভিনীত হয়েছে।

লেখক: হাকিম মাহি।

শিক্ষার্থী-জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

hakimmahi2017@gmail.com

 

 

Share.

Leave A Reply

sixty eight − = sixty six